আবার এসো ফিরে

ঈশ্বরচন্দ্র উঠে ঘরে চলে গেলেন। অল্প কথার মানুষ তিনি দুঃখ পেয়েছেন মনে। তবে তার প্রকাশ ঘটাতে চান না। আসল যে কথা বলে তিনি দীনময়ীকে আশ্বস্ত করবেন ভেবেছিলেন, তা আর বলা হল না। মনে মনে তিনিও চান, দীনময়ীর গর্ভে

এখন একটা সন্তান আসুক। তবে এও স্থির করলেন, পরে একসময় দীনময়ীর মনের ভুল ভাঙবেন। চেয়ার  ছেড়ে ওঠার আগে বলে গেলেন, অন্নপূর্ণা নামের সই থেকে তুমি

দূরে থেকো, দিনময়ী

(৪)

 

গত রাতের ঘটনাটা ঈশ্বরচন্দ্র মন থেকে মুছে ভগবতীদেবীর সামনে এসেছেন। আজ মাকে তাঁর কথাটা শোনাবেন। তা যতই কিনা, মা শুনতে না চান। তিনদিন হল তিনি এসেছেন। বারবার কথা উত্থাপন করতে গিয়ে বাধা পেয়েছেন। ভগবতীদেবী যুক্তি দিয়েছেন,  আগে ছেলে নিজের স্ত্রীকে দেখুক। সে সুস্থ হয়ে উঠলে পরে সব কথা হবে।

গতরাতে দীনময়ীর সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের কথাবার্তার পর, তাঁর মনে হয়েছে, দিনময়ী এখন প্রায় সুস্থ। এবার তাঁকে কলিকাতায় ফিরতে হবে। তার আগে মায়ের কাছে অনুমতিটা নিয়ে তিনি ফিরবেন। কাজে ইস্তফা দিচ্ছেন, এ বিষয়ে মায়ের অনুমতি নেওয়া তাঁর প্রয়োজন। ভাই দীনুর কথাটা তাঁর স্মরণে আছে। যতই হোক সেও এখন পড়াশোনা শেষে বিদ্যারত্ন হয়েছে। চাকরী করছে। তার কথার তো একটা মূল্য রয়েছে।

ঈশ্বরচন্দ্র ভগবতীদেবীকে বললেন, মা, ও তো অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। কাল পথ্য নেবে। আমায়  এবার ফিরতে হয়।

কোনও রকম ভণিতা না করেই আজ ঈশ্বরচন্দ্র সরাসরি প্রসঙ্গে আসলেন। প্রকৃত উদ্দেশ্যটা প্রথম দিকে উহ্য রাখলেন। কথার মাঝে সঠিক সময়ে তা জানান দেবেন মাকে,- এমনটা চিন্তা করে  রেখেছেন।

ভগবতীদেবী বললেন, আর কয়েকটা দিন থেকে গেলে হত না?

-না মা। আমি তো সামান্য কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে এসেছি। তোর কাছেই আমার আসা। তবে এখানে এসে দীনময়ীকে অসুস্থ দেখে কটা দিন থেকে যেতে হল। এবার যাবার আগে আমি একটা কথা পাড়ছি। আশারাখি  আমাকে সে কাজে অনুমতি দিবি।

-আমার অনুমতি! কী কথা?

-মা, আমি বর্তমান চাকরীতে ইস্তফা দিচ্ছি। তোকে জানাতে এসেছি। এজন্যে তোর অনুমতি পাওয়া আমার দরকার।

কথাটা সরাসরি উগরে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন ঈশ্বরচন্দ্র। ভগবতীদেবী  আশ্চর্য হলেন। বললেন, ইস্তফা! কেন? কাজে মন বসছে না? পরে আবার কথা যোগ করলেন, অবশ্য তা তো হতেই পারে। একলা একলা দূরে পড়ে রয়েছ, কাজে মন বসাবে কেমন করে?

মায়ের-মন এর বাইরে আর কি ভাবতে পারে? ছেলের মন বোঝা কি তাঁর কোনও কঠিন কাজ? তিনি নারী । ছেলের বউ গর্ভধারণ না করার জন্যে তার ওপর যতই ক্ষোভ থাকুক, তিনিও বোঝেন নিঃসন্তান নারীর মনের কষ্ট । সে যে কী  ভার, তা তো আর বলে বোঝাতে হবে না তাঁকে? নিজের যৌবনকালটা  ভুলে যাননি তিনি  । যদিবা এতগুলো ছেলেপুলের মা হয়েছেন, তবে তাঁরও বিবাহিত জীবনের প্রথমাবস্থায় এই ভার বইতে হয়েছিল। আর দীনময়ীর ক্ষেত্রে তো সেটা অতিভারি ঠেকবে। এতকাল কাটলেও  এখনও একটা সন্তানের জন্ম দিতে পারল না…

ভগবতীদেবীর অমন ভাবনার খণ্ডন করবার জন্যে ঈশ্বরচন্দ্রের অবশ্যই কিছু বলবার ছিল। তবে ভগবতীদেবী  সে সুযোগ না দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন,- এবার যেমন করে  হোক বউমাকে কাছে নিয়ে গিয়ে রাখো। দেখবে মন ভালো হয়ে যাবে। কাজে মন বসাতে পারবে। ইস্তফার কথাটা নাই বা চিন্তা করলে।

-মা, কথাটা তা নয়। কাজে আমার মন ঠিকই আছে। তবে ওই কাজে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের  সঙ্গে আমার বনিবনা হচ্ছে না। সেকারণেই ইস্তফা দিচ্ছি।

-সেটা কি খুব গুরুতর বিষয়, ঈশ্বর?

-মা, তোর কাছে সব ব্যাখ্যা করতে হলে অনেক কথা বলতে হয়। তাই সেসব কথা আর ওঠাচ্ছি না। তবে জেনে রাখ, কারোও কাছে মাথা নুইয়ে  কাজ করবার জন্যে তোর এই ছেলেকে জন্ম দিসনি। আমার শিক্ষাদীক্ষাও সেরকম নয়। এখন যদি সেখানে আমার কাজে কেউ বাধা দেয়,  তো সেখানে কাজ করার থেকে কাজে ইস্তফা দেওয়াকে আমি উপযুক্ত মনে করি।

বেশ দৃঢ়তার সাথে কথা বললেন ঈশ্বরচন্দ্র। ইতিপূর্বে কলিকাতা ছাড়ার আগে এবিষয়ে তিনি দীনবন্ধুকে সব কথা খুলে বলে এসেছিলেন। মায়ের সামনে একই কথা বলতে গেলে কথার দ্বিরুক্তি হবে। দীনু যেটা সহজে বুঝেছে, মা হয়তো তা বুঝবে না। তাই ইস্তফার কারণটা অতি সংক্ষেপে বলে দিলেন। তবুও মায়ের মন। সেখানে হাজারো প্রশ্নের উদয় হতে বাধ্য। তার মধ্যে একটা যেমন, সন্তানের স্ত্রীসঙ্গ না পাওয়া; তেমনই রয়েছে জাহাজের মতো বিশাল সংসারটার হাল মাস্তুল ঠিক রেখে তাকে বয়ে নিয়ে চলা। মনের কথাটা মুখে প্রকাশ করে বসলেন, তাহলে দিন চলবে কেমন করে , ঈশ্বর?

-কেন আলু পটল বেচব, মুদির দোকান করব।

ছেলের কথায় প্রত্যয়ের প্রকাশ থাকলেও ভগবতীদেবীর চিন্তা অন্য। তিনি জানেন, তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান কলিকাতায় যথেষ্ট সুনাম অধিকার করেছে, তাই মুখে সে যা ব্যক্ত করছে, কাজে করা তা কতখানি কঠিন। সেকারণে তিনি বললেন, তা কি তোমার মতো বিশিষ্ট মানুষের পক্ষে সম্ভব?

-খুব সম্ভব, মা। যে পদে সম্মান নেই, সে পদ আমি গ্রহণ করতে পারব না। তুই আমাকে অনুমতি দে।

ভগবতীদেবী চুপ করে  রইলেন। তিনি জানেন, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের জেদ। লোকের অধীন হয়ে চলা তার  কাছে বিষময় বস্তু। তার থেকে স্বাধীনভাবে থাকতে পারলে সে যে অনেক কিছু করতে পারবে, এ কথা তিনি বোঝেন। বাকি ব্যাপারটা রইল, চাকরীবিহীন পরিবারের দারিদ্র্যের জীবন। সেটা আর তাঁর কাছে নতুন কী? নিজের জীবন দিয়েই তিনি তা বোঝেন। মায়ের সঙ্গে মাতুলালয়ে মাথাগুঁজে মানুষ হয়েছিলেন তিনি। সেখানে দারিদ্র ছিল নিত্যসঙ্গী। তাই তাঁর কাছে দারিদ্র্য কোনও নতুন জিনিষ নয়।

চুপ করে গেলেন ভগবতীদেবী। পুরনো কথা ভাবতে থাকলেন, বাবা ছিলেন তর্কবাগীশ। অতি সাত্ত্বিক মানুষ। ধর্মচিন্তা, ধর্ম আলোচনা, সাধন ভজন নিয়ে থাকতে ভালোবাসতেন। সংসার, সুখ, বিষয় কর্মে একেবারেই মন ছিল না। সেসব এড়িয়ে চলতেন। বহুকাল শব সাধনায় নিজেকে যুক্ত রাখার কারণে  উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন।  মা বুঝেছিলেন, অমন স্বামীকে দিয়ে মেয়েদের মানুষ করা সম্ভব নয়।  দুই মেয়ে এবং উন্মাদ স্বামীকে নিয়ে  শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে মা পাতুল গ্রামে গিয়ে উঠে ছিলেন। বাবার কাছে।  দাদামশাইয়ের মৃত্যু হয় অল্পদিনে। মা ঠাঁই নেয় ভাইয়ের সংসারে। তাঁর নিজের মামা, রাধামোহন বিদ্যাভূষণ ছিলেন ঈশ্বরতুল্য মানুষ। যেমন নিজের ছেলে মেয়েদের প্রতি যত্নবান ছিলেন, ততখানিই ছিলেন তাঁদের প্রতি। ওই পরিবেশে তিনি আর তাঁর বোন, লক্ষ্মী মানুষ হয়েছেন…

 

ভগবতীদেবী চুপ করে ভাবছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বলে ওঠেন, কি? খুব চিন্তায় পড়লি, মা?

-চিন্তা আর কী? ভাবছিলাম আমি যে সহজ জীবনে ঠাকুর দেবতাকে মান্যি করে মানুষ হয়ে উঠেছি, সেই আমারই সন্তান তো তুমি। তুমি সামনের দিনকে কেন ভয় পাবে?…নাহ, ঠিক আছে। তোমার ওপর আমার ভরসা রয়েছে, তুমি কোনও অন্যায় কাজ করছ না। ইস্তফা পত্র দিয়ে দাও। সামনের দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যাও।   তোমার সব কাজে আমার আশীর্বাদ রইল।

ঈশ্বরচন্দ্র নিশ্চিন্ত হলেন। হাত বাড়িয়ে মায়ের পা ছুঁলেন। হাত মাথায় ঠেকালেন। বিদায় নিয়ে চললেন বাবার কাছে। তাঁকেও বিষয়টা জানালেন।

কলিকাতার হালচাল ঠাকুরদাসের জানা রয়েছে। সেখানে  জীবনের একটা দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন তিনি। কষ্ট করে  নিজের এবং পরের সন্তানদের নিয়ে এ বাড়ি, ও বাড়িতে ভাড়া থেকে দিন কাটিয়েছেন। সন্তানদের মানুষ করে  তুলেছেন। যথোপযুক্ত মূল্যও তারা দিয়েছে। ঈশ্বর নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। পণ্ডিত হয়েছে। উপাধি পেয়েছে। এমন সন্তানের মনে যদি সত্যিই চাকরীর জন্যে কোনও ক্ষোভ হয়ে থাকে, যা তাকে চাকরী থেকে রেহাই নিতে বাধ্য করছে, সেখানে তার মতকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তিনিও ঈশ্বরের কাজে সহমত পোষণ করে ইস্তফা দেবার বিয়য়টায় অনুমোদন দিয়ে দিলেন।

বাকি রইল দীনময়ীকে জানানো। তবে এবিষয়ে সে বেচারি কিছুই হয়তো বুঝবে না। তাঁর কাছে গিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র কলিকাতা ফেরার তাড়াটাই শুধু ব্যক্ত করলেন। সঙ্গে একটা কথা যোগ করলেন, কলিকাতায় ফিরে বর্তমান চাকরীতে ইস্তফা দিচ্ছি।

দীনময়ী শুনলেন। এ ক্ষেত্রে তার সাধ্যি কী যে স্বামীর কাজে নিষেধ করেন? স্বামীর চাকরীটা কী, তাই তো ভালো করে  জানা নেই। শুধু জানেন, তিনি পণ্ডিত মানুষ। শহরে কোন এক কলেজে পড়ানোর কাজ করেন । এখন সেখানে চাকরীতে থাকা, না থাকা, তার মর্ম কি আর তাঁর জানা আছে? তাই আর পাঁচটা সাধারণ নারীর মতো মনের  কথা মুখে এনে বললেন, যা ভালো বোঝেন করবেন। ভালয় ভালয় পৌঁছিয়ে সত্বর সংবাদ দিয়ে চিন্তা মুক্ত করবেন। কী করছেন, অবশ্যই, অবশ্যই জানাবেন।

বিদায়ের আগের রাতে যতখানি সম্ভব কান্নাকাটি করে  স্বামীর মনে নিজের আসনটাকে আর একবার শক্ত ভিতে গেঁথে দিলেন দীনময়ী। বিদায় বেলায় অশ্রু ঝরিয়ে স্বামীর যাত্রাপথে অমঙ্গলের কাঁটা বেছালেন না।  তবে পরে কাঁদলেন ঠিকই। নিঃশব্দের কান্না। মনে মনে । একলা। রাতের বিছানায় শুয়ে বুক ভাসালেন। মুখ ফুটল না।

ঈশ্বরচন্দ্র কলিকাতায় ফিরে গেলেন।

কলিকাতায় ফিরে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো মানুষ কর্মহীন হয়ে বসে থাকবেন, এ দুর্ভাবনা তাঁর স্ত্রীর মনে আসলেও, তিনি যে কী প্রকৃতির কর্মঠ এবং উদ্যমী পুরুষ, তা বোধ হয়, এতদিনেও দীনময়ীর গোচরে আসেনি। তাতে আর দোষ কী? বিয়ের পর এতকাল পর্যন্ত দীনয়মী দূরে দূরে থেকেই দিন কাটিয়েছে। স্বামীসঙ্গ বলতে ওই দিন কয়েকের একত্র বাস। কিন্তু স্বামী যে দূরে থেকে কী কাজ করে, কাজ না থাকলে কেমন করে  দিন কাটাবে, এ চিন্তা থাকা স্বাভাবিক হয়েছে দীনময়ীর ক্ষেত্রে। তাই তিনি স্বামীকে বারবার করে  অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কলিকাতায় ফিরে কী করছেন, তা যেন তাকে জানান ।

ফেরার কুশল সংবাদ দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র ইতিমধ্যে ভগবতীদেবীর কাছে পত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন । তবে আজ তিনি বসেছেন দ্বিতীয় পত্র লিখতে। দীনময়ীর উদ্দেশ্যে। লিখলেন,

শ্রীশ্রীহরিঃশরণম

গুণালঙ্কৃত শ্রীমতী দীনময়ীদেবী কল্যাণনিলয়েষু

ইতিপূর্বে মাকে লেখা চিঠিতে আমার পৌঁছানো সংবাদ দিয়েছি। তা অবশ্যই জেনেছ । কুশলেই পৌঁছেছি। এবং এখনও কুশলে আছি। তোমায় এই চিঠি লিখছি কারণ  বীরসিংহ ছাড়বার আগে তোমাকে বেশ বিচলিত দেখে এসেছিলাম। আমার ইস্তফার পরে আমি কী করব, তাই তোমার চিন্তা ছিল। তবে এখন জানাচ্ছি , আমি আমার নিত্যকার কাজে আবার আগের মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। সে অনেক কাজ। পুরো ফিরিস্তি দিয়ে বোঝানো সম্ভব হবে না। তবে জেনে রাখো, সবটাই পড়ালেখার কাজ। বিভিন্ন বই রচনা করা। যার মধ্যে কাহিনী পুস্তক ছাড়াও ইতিহাস বই রয়েছে। বাংলার ইতিহাস। ইংরেজ লেখকের বই অনুবাদ করছি।

আরও একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাজ হাতে নিয়েছি। তা হল, লিখিত বাংলা ভাষাকে সহজ অক্ষরে আনবার কাজ। তার মধ্যে আছে দু ভাগে বর্ণপরিচয়, কথামালা আর চরিতাবলী। এটাই লম্বা সময়ের কাজ। হয়তো কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। জানি না, তা কবে শেষ হবে। তবে তুমি তো জানো দীনময়ী, আমি যে কাজ হাতে নিই, তা নিয়েই  চতুর্দিকে হুলুস্থুল পড়ে যায়। কিন্তু আমি স্থির চিত্তে নিশ্চিন্ত মনে আমার কাজ করে যাই। তাই, এইসব বিষয়ে তোমাকে জানাচ্ছি, আমার এই পরিকল্পনার কথাবার্তা এখনই পাঁচকান না করাই ভালো। অবশ্য এ বিষয়ে তোমার উপর আমার আস্থা রয়েছে।

অধিক কী? আমার কী আর কাজের শেষ আছে। তুমি এও জানো, আমি এবং আমার সুহৃদ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার মশায় মিলে যে সংস্কৃত মুদ্রাযন্ত্র বসিয়েছি, তাতেও বই ছাপার কাজের বিরাম নেই। অনেক বিদ্যানজনেরা সংস্কৃত ভাষায় বই লিখে নিয়ে আসছেন। ছাপাবার জন্যে। অতএব তোমার কোনও চিন্তার কারণ নেই। কাজে কাজে আমি দম ফেলবার ফুরসৎ পাচ্ছি না। চাকরিতে  ইস্তফা দেওয়া আমার পক্ষে যে মঙ্গলজনক হয়েছে, এখন তা ভালোই বুঝছি।

সবশেষ তোমাকে একটা ঘটনার কথা লিখে এই চিঠি শেষ করব। তা  শুনলে তুমি হাসবে।

আবার এসো ফিরে

এক সম্ভ্রান্তলোক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি আমাদের মুদ্রাযন্ত্র আপিসে এসেছিলেন । সেখানে তিনি বেশ কিছু বই সুন্দর বাঁধানো অবস্থায় দেখে টিপ্পনী কাটলেন, মহাশয়, বহু টাকা খরচা করে এই বইগুলো বাঁধানো কি খুব যুক্তির কাজ হয়েছে?  আমি তাঁকে প্রশ্ন করি, কেন, এতে দোষ কি? উনি বললেন, ওই টাকায় অনেকের উপকার হতে পারত। ওনার কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। পরে অন্য কথা পারলাম। ভদ্রলোকের গায়ে একটা শাল ছিল। দেখে বুঝলাম, শালখানা বেশ দামী। উপস্থিত বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। প্রশ্ন করলাম, মশায়, আপনার এই শাল জোড়া কোথায় কত টাকায় কিনেছেন?  জিনিষটা তো বেশ হয়েছে! আমার কথায় বাবু একটু অসাবধান হয়ে শালের নানান গুণ বর্ণনা করে বললেন, শালটার দাম পাঁচশ টাকা। তাও দুবছর আগে কেনা। আমি বললাম, মশায়, শাল তো ঠাণ্ডা দূর করবার জন্যে পরা। পাঁচ সিকের কম্বলেও তো শীত দূর হয়। তবে এত টাকার শাল  গায়ে দেবার প্রয়োজন কী? ওই টাকায়ও তো অনেকের উপকার হত। আমার গায়ের চাদরটা দেখিয়ে বললাম, সারা শীত আমি এই মোটা চাদর গায়ে দিয়ে থাকি।  এর দাম পাঁচ টাকা। ভদ্রলোক আমার কথা শুনে লজ্জা পেয়ে গেলেন। নিজের অন্যায় স্বীকার করে ছাপাখানা থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চলে গেলেন। আমি হাসতে থাকলাম।

আচ্ছা, চিঠি আজ এখানেই শেষ করলাম। সাবধানে থেকো। শরীরের প্রতি যত্ন নিও।

ইতি

আশীর্বাদক স্বামী

ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা

 

চলবে…

শেয়ার করতে:

You cannot copy content of this page