সুবর্ণভূমে পুষ্পকেতু

অনন্যা পাল

চতুর্থ পর্বের পর…

ভূজঙ্গ উপত্যকা

গোধূলির লালিমায় স্বপ্নময় তটভূমি, সোনালী বালুকার বুকে আছড়ে পড়ছে ঢেউ যেন এক অদৃশ্য ছন্দে; বহিত্র থেকে সেদিকেই চেয়ে থাকেন পুষ্পকেতু মুগ্ধচোখে। অর্ণবযান তটভূমি অবধি যাবেনা, কিছু দূরে সমুদ্রের অগভীর বুকে নোঙর বেঁধেছে তাই। যানের সাথে বাঁধা ডিঙি নৌকা নামিয়ে একে একে যাত্রীদের পাড়ে নেবার ব্যবস্থা হয়েছে। ওদিকে বন্দর থেকে যানগুলির দিকে ভেসে আসছে কিছু নৌকা, মকরমুখী নৌকাগুলি লম্বায় প্রায় তিরিশ হাত, স্থানীয় মাল্লারা দ্রুত দাঁড় বেয়ে টেনে নিয়ে আসছে তাদের, উদ্দেশ্য মূল্যের বিনিময়ে সদ্য আগত যানগুলির থেকে পণ্য বয়ে ঘাটে নিয়ে যাওয়া। বাণিজ্য পোতগুলি এদের সাহায্যে পণ্য আনা নেওয়া করতে পারে সহজে, এরা যেমন দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ, তেমনি এদের নিয়মানুবর্তিয়া, বোঝা যায় এতগুলি শতাব্দী ধরে কটাহ বন্দর সমুদ্র বণিকদের কাছে এত জনপ্রিয় কেন।

ডিঙি থেকে বেলাভূমিতে পা রাখেন পুষ্পকেতু, সমুদ্রের দূরন্ত বাতাসে এলোমেলো হতে চায় কেশ, বসন; নতুন দেশের আবহাওয়ায় গভীর নিঃশ্বাস নেন কুমার, ‘সুবর্ণভূমি!’, অবশেষে পা রেখেছেন এক স্বপ্নের দেশে, অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে তাঁর ঠোঁটের কোনে।

 

‘কেমন বোধ করছ হে?’ মোটবাহী বন্দরকর্মীর পিছু পিছু চলতে চলতে উল্মুককে প্রশ্ন করেন তিনি।

‘ঠিক বুঝতে পারছি না।‘

‘কি বুঝতে পারছ না?’

‘এই, কেমন বোধ করছি আর কি। এখনও অবধি যা দেখলাম, তাতে স্থানীয় লোকগুলিকে মানুষরূপী পুতুল বলে বোধ হচ্ছে, যেন কোনও অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা, সুতোর টানে যন্ত্রের মত চলে বেড়াচ্ছে, কাজ করছে। মুখের ভাষাও ভারি অদ্ভুত, যেন বুঝেও ঠিক বুঝে ওঠা যায় না’।

‘এত অল্পেই বিমূঢ় হয়ে পড়লে? ওরা প্রাকত ভাষাতেই কথা বলছে হে, তবে এদের নিজস্ব ভাষার মিশ্রনে তার উচ্চারণে কিছু অপভ্রংশ ঘটেছে; একটু মন দিয়ে শুনলে বেশ বুঝতে পারবে’।

‘নিম্নশ্রেণীর মুখের ভাষায় উচ্চারণ দোষ থাকলেও, ভদ্রশ্রেণীর লোকেরা আমাদের মতই প্রাকৃত বলে থাকেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন ভদ্র’, পিছন থেকে দেবদত্ত বলে ওঠেন উল্মুক কে উদ্দেশ্য করে।

বেলাভূমি ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে জনবসতি, মূলতঃ বন্দরকে কেন্দ্র করেই তার বেড়ে ওঠা; শুন্ডিগৃহ, পান্থশালা, রকমারি স্থানীয় ও বিদেশী পণ্যের বাহারি দোকানপাট, শুল্ক দপ্তর ও অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তর; আরো একটু ভিতরে এগোলে রয়েছে গৃহস্থ পল্লী। সম্পূর্ণ নগরটি সমুদ্রের তট বেয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানেই যাওয়া যাক, সমুদ্র কাছেই আছে বোঝা যায় ঢেউয়ের গর্জন থেকে, তাম্রলিপ্তের সাথে এই নগর বন্দরের মূল তফাত সেখানেই।

মগধ রাজপুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট অতিথিশালাটির একপাশে সমুদ্রতট, শয়ন কক্ষ থেকে দেখা যায় তার অবিশ্রান্ত তরঙ্গের খেলা। এই ভবনটি মগধরাজের আনুকুল্যেই তৈরী হয়েছে, সেখানে আতিথ্য নেন রাজকীয় কাজে ভ্রাম্যমান মাগধী রাজপুরুষেরা। ভবনটির তত্ত্বাবধায়ক ধনঞ্জয় একজন মাগধী, তিনি আর্য হলেও বহুকাল হোল কটাহতেই সংসার পেতেছেন। তাঁর স্ত্রী একজন স্থানীয় শ্রেষ্ঠীর কন্যা, দুটি পুত্রসন্তান নিয়ে শান্তির সংসার। ধনঞ্জয় অতিথিশালার একপাশে তৈরী নিজস্ব আবাসনে পরিবার নিয়ে বাস করেন। এছাড়া ভবনের যাবতীয় সেবক ও দাসী স্থানীয় বংশোদ্ভূত।

পরদিন ভোরের নরম আলোয় ঘুম ভেঙে যায়, পাখির কুজন ভেসে আসে বাইরে থেকে; ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ান পুষ্পকেতু; স্বচ্ছ আকাশের ছায়া পড়ে সমুদ্রের জল ঘন নীল, সোনালি বালুকায় আলোর ঝিকিমিকি, কিছুদূরে নারিকেল বৃক্ষের সারি বাতাসের আহবানে সাড়া দিয়ে দুলে দুলে উঠছে। উল্মুক তখনও নিদ্রামগ্ন, দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তিতে আবিষ্ট; তাঁর দিকে একবার দৃষ্টিপাত করে ধীরে ধীরে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন কুমার, বেলাভূমির আকর্ষন বড় দুর্নিবার। অতিথিশালার ভবনটি দুইতল বিশিষ্ট, উপরের তলে সারি সারি অতিথিদের শয়নকক্ষ, নীচে বসবার ঘর, ভোজন কক্ষ, ধনঞ্জয়ের কর্মকক্ষ, সেবকদের শয়নকক্ষ; উঠানের একপাশে স্নানাগার, অন্যপাশে পাকশালা। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে আসতে দেখা হয়ে যায় ধনঞ্জয়ের সাথে, এই প্রত্যুষেও তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অতিথি সেবার তত্ত্বাবধানে। আপাতত, পাকশালের ব্যাঞ্জন তালিকা নিয়ে চলছে আলোচনা প্রধান পাচকের সাথে।

‘আপনি এরই মধ্যে শয্যাত্যাগ করেছেন আর্য! রাত্রিকালে নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটেনি তো কোনও?’ পুষ্পকেতুকে দেখে বলে ওঠেন ধনঞ্জয়।

‘আপনার সুনিপুণ ব্যবস্থাপনায় কোনও অসুবিধা হয়নি ভদ্র, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।‘

‘আপনি কি বেলাভূমির দিকে চলেছেন কুমার, তার আগে একটু ফলরস পান করে যান, এখানকার কালিঞ্জ বড় মিষ্ট’।

‘এই অঘ্রানে কালিঞ্জ, বলেন কি?’ কেতু অবাক হন।

‘সুবর্ণভূমি, চিরবসন্তের দেশ, আম্র, পনস, কালিঞ্জ এখানে বারোমাসা ফল’।

‘বেশ, কালিঞ্জ রস অবশ্য পান করব, তার আগে বেলাভূমি থেকে ঘুরে আসি’, কথা কটি বলে বেরিয়ে যান কুমার আপনমনে।

সামনে যতদূর দৃষ্টি যায় সমুদ্রের তটভূমি, এই তট ধরে হেঁটে গেলে বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব, পূর্বদিকে চোখে পড়ে পর্বতমালা, ঘন সবুজে ঢাকা। একই ভূখন্ডে পাহাড় ও সমুদ্রের এই সমন্বয় পুষ্পকেতুতে আশ্চর্য্য করে, এখানকার পর্বতের এই শ্যামলিমাও ভারি কোমল, মনলোভা। আবার দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি ফেরান কেতু, পাদুকাদুটি খুলে রেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে যান জলের দিকে। ছোট ছোট ঢেউ চুম্বন করে যায় তাঁর পায়ের পাতা, স্নিগ্ধ জলের স্পর্শে হালকা কেঁপে ওঠেন কুমার, এক গভীর ভালোলাগায় ভরে ওঠে মন। কিছু দূরে চোখে পড়ে দুটি বালক বালিকা, বোধকরি বালুতটে শামুক সংগ্রহ করছিল তারা, কিন্তু পুষ্পকেতুকে দেখে থেমে গেছে তাদের গতি,আগ্রহভরে লক্ষ্য করছে তাঁকে। সুদর্শন চেহারার কারণে সহজেই অন্যের মনযোগ আকর্ষণ করেন তিনি, এরূপ ব্যবহারে অভ্যস্ত কুমার, কিন্তু এই মূহূর্ত্তে তিনি নিজেও আগ্রহ বোধ করেন বালক-বালিকা দুটির  প্রতি কিছু বিশেষ কারণে। এদের আকৃতি স্থানীয় মালব বাসীদের থেকে একেবারে আলাদা, খর্বকায়, গায়ের রং ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, মাথায় কোঁকড়া চুল, হাতে পায়ের পেশী অত্যন্ত বলিষ্ঠ। কৌতুহলী হয়ে তাদের দিকে এগিয়ে যান পুষ্পকেতু, তাঁকে এগোতে দেখে পায়ে পায়ে পিছু হটে তারা এবং ক্রমে নারিকেল গাছের সারির পিছনে অদৃশ্য হয়ে যায় দ্রূত। কুমার সরে আসেন সেখান থেকে, বেশ কিছুক্ষণ বালুতটে সময় কাটিয়ে ফিরে যান অতিথিশালায়।

এতক্ষণে অতিথিশালায় প্রাণ সঞ্চার ঘটেছে, অতিথিরা প্রায় সকলেই শয্যাত্যাগ করেছেন, নীচের ভোজনকক্ষে সেবকদের ব্যস্ততা। উল্মুক সেখানে একটি পিঠিকায় বসে ধনঞ্জয়ের সাথে বাক্যালাপে মগ্ন, বন্ধুর ফেরার অপেক্ষায় তখনও আহারের উদ্যোগ নেননি। পুষ্পকেতু আলাপে যোগ দেন কক্ষে প্রবেশ করে, ধনঞ্জয়ের ইশারায় একটি সেবক সামনে রেখে যায় আহার্য্য সামগ্রী।

‘কালিঞ্জ রস অতি মিষ্ট, আম্রফলও মাগধী আমকে লজ্জা দেবে স্বাদে। অঘ্রানে এমন অমৃতফললাভ যে এককথায় স্বর্গীয়!’ উল্মুক উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন ফলাহার করতে করতে।

‘এটি কি ফল ভদ্র?’ একটি পীতাভ লাল বর্ণের ফল হাতে নিয়ে প্রশ্ন করেন পুষ্পকেতু। ফলটি পাঁচটি কোণযুক্ত এবং আকারে অনেকটা সুগন্ধী নিম্বুর মত।

‘এর নাম কর্মরঙ্গা, টুকরো করলে দেখতে একেবারের আকাশের নক্ষত্র’, কথাটি বলে ধনঞ্জয় একটি ফল ছুরিকা দিয়ে কেটে টুকরো করেন। টুকরোগুলি হুবহু তারকার আকৃতি নেয়, আশ্চর্য্য হয়ে তাকিয়ে থাকেন দুই বন্ধু সেইদিকে।

এভাবেই শুরু হয় নতুন দেশে দুই তরুণের অভিজ্ঞতা; জাহাজ মেরামতি ও রসদ সংগ্রহে অর্ধপক্ষকাল সময় লাগবে, এই কদিনের যাত্রা বিরতিতে কটাহদেশ ঘুরে ফিরে দেখতে চান দুজনে। দেবদত্ত ব্যস্ত রয়েছেন পণ্য বিক্রয়ে, চতুর্ভুজকেও সঙ্গে পাওয়া দুষ্কর; অতঃপর নিজেরাই ঘুরে ফিরে দেখেন রাস্তাঘাট, পণ্যবীথি। পণ্যবীথির বিভিন্ন দোকানে চমকপ্রদ সব পশরা, বাহারে তাদের প্রদর্শনী। রকমারি মশলার সম্ভার সাজানো থাকে বাহারে বিপণিতে, তাদের বিচিত্র সুগন্ধে ভরে থাকে চারপাশ; মশলা বিক্রয়ের মাপদণ্ডটি ও অভিনব। নারিকেল মালা দিয়ে মাপা হয় পণ্যদ্রব্য, অল্প পরিমাণ পণ্যের জন্য ক্ষুদ্র মালা, বেশী পরিমাপের জন্যে বড় মালার বন্দোবস্ত। শুধু মশলা নয়, গন্ধক বিক্রয়েও ব্যবহার হয় এই মাপদণ্ড। এছাড়া আছে হাতলে কারুকাজ করা বিভিন্ন অস্ত্র; এদেশের অস্ত্রের হাতলে দেবদেবীর মূর্তি বসানো প্রচলিত রীতি; সম্ভবত সৌভাগ্য-কবজ হিসাবেই দেবমূর্তির এই ব্যবহার। দেখেশুনে নিজের জন্যে নৃসিংহ মূর্ত্তি বিশিষ্ট একটি খঞ্জর খরিদ করেন পুষ্পকেতু। পণ্যবীথিতে ছোট ছোট পশরা নিয়ে বসে কিছু  মানুষ, খর্বকায়, কৃষ্ণবর্ণ, পরনে গাছের বাকল থেকে তৈরী খাটো বস্ত্র, উর্ধাঙ্গ নগ্ন, গলায় তাদের শামুক ও পুঁতির মালা; এরা উপজাতীয়, পাহাড়ের পদমূলে জঙ্গলের উপান্তে এদের বাস। বালুতটে দেখা বালক-বালিকা দুটি এদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত বুঝতে পারেন কুমার। এরা বিক্রয় করে নানান রকম কাঠের মূর্ত্তি ও মুখোশ, দেখতে বিচিত্র হলেও সেগুলির গঠন শৈলী অতি অপূর্ব। এরা সভ্য জগতের ভাষা জানেনা, তবু ইশারাতেই চলে ক্রয়বিক্রয়। উল্মুক একটি জান্তব মুখোশ কেনেন একজনের কাছ থেকে, সেটির প্রতিটি রেখায় রেখায় ফুটে উঠেছে কঠিন হিংস্রতা, শিল্পীর অনুপম ভাস্কর্যের এ এক অদ্ভূত নিদর্শন।

‘শেষে এই পশুমুখই পছন্দ হোল? এ জিনিষ তোমার চরিত্রের সাথে একেবারেই খাপ খায়না।‘ মন্তব্য করেন পুষ্পকেতু।

‘চরিত্রের বিপরীত, সেকারণেই তো মুখোশ হে!’ হেসে উত্তর দেন উল্মুক।

 

প্রতিদিন সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করেন পুষ্পকেতু, সমুদ্রের নিবিড় নীলিমা, সোনালী বেলাভূমি, দেখে যেন আশ মেটেনা। উল্মুকও সঙ্গী হন তাঁর, দুজনে নিঃশব্দে পদচারণা করেন, একজন ডুবে থাকেন স্মৃতিতে, অন্যজন স্বপ্ন দেখেন আগামী গন্তব্যের। বালক-বালিকা দুটিও আসে প্রতিদিন, দূর থেকে লক্ষ্য করে দুই আর্য তরুণকে। তাদের প্রতি নিরাসক্ত থাকেন কুমার, তাতে ধীরে ধীরে শঙ্কা কেটেছে শিশু দুটির, বালুতট থেকে পালিয়ে যায় না তারা আর।

‘নাম কি তোমাদের?’ সেদিন ছেলে মেয়ে দুটি কাছে এসে দাঁড়িয়েছে নিঃশব্দে, পুষ্পকেতু স্নেহবশে জিজ্ঞাসা করেন। কাছ থেকে দেখে বোঝা যায় এরা শিশু নয় নেহাৎ, কিশোর বয়স্ক। তাদের উজ্জ্বল চোখের নিষ্পাপ সরল দৃষ্টি মনকে নাড়া দেয়। মেয়েটি হেসে ওঠে, তার শ্বেত শুভ্র দাঁতের পাটির সৌষ্ঠবে জোছনা খেলে যায় শ্যামল মুখে। এবার উল্মুক হাতের ভঙ্গীতে জানতে চান তাদের পরিচয়, দুই তিনবারের চেষ্টায় বোধহয় বুঝতে পারে তারা। ছেলেটি গলা থেকে অদ্ভুত শব্দ বের করে উত্তরে।

‘ওরে বাবা নাম জানতে চেয়ে বিপদ হোল দেখি; নাম তো নয় এ যে গর্জন!’ উল্মুক রসিকতা করেন। তাঁর পরিহাসে পুষ্পকেতুর সাথে সাথে ছেলে মেয়ে দুটিও হেসে ওঠে সরল ভাবে।

‘আমরা তোমাদের দুটি নতুন নাম দিই বরং কি বল? বেলাভূমিতে দেখা হোল, তাই তুমি বেলা, আর তোমার নাম ধী কেমন?’ পুষ্পকেতু যথাক্রমে বালিকা ও বালকটিকে বুঝিয়ে বলেন। দুজনেই খুশী হয়ে মাথা নাড়ে, যদিও কথাকটি তার বুঝেছে কিনা জানা যায় না। তবে একটু পরে নতুন নামে ডাকতে ছেলেটি বেশ সাড়া দেয়, নামের শব্দটি হয়তো মনে ধরেছে তার।

পর্বত ঘেরা কটাহ রাজ্য, নাম মাহাত্যে তার আকার একটি কটাহের মতই, চারপাশে পাহাড়, মাঝখানে সমতল ভূমি।  রাজা শ্রীমার-মহাবংশ কটাহ দেশের নৃপতি, তাঁর পূর্বপুরুষ এসেছিলেন আর্যাবর্ত থেকে; মিশ্র রক্তের সন্তান হলেও তিনি আর্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। বন্দর থেকে কিছু দূরে ঘন সবুজ ভূজঙ্গ উপত্যকা তাঁর রাজধানী; উপত্যকা বেয়ে সর্পিল গতিতে বয়ে চলেছে ভূজঙ্গ নদী, তার নামেই উপত্যকার নামকরণ। কটাহ বন্দরের অপরীসীম আয় ছাড়াও, শস্যশ্যামলা দেশটি কৃষিকার্যে  উন্নত; এছাড়াও উপত্যকা অঞ্চল স্বর্ণ, লৌহ ও স্বর্ণজ খনিজে সম্বৃদ্ধ, খনিজ ধাতু নিষ্কাষণ ও পরিশুদ্ধির জন্য স্থানে স্থানে রয়েছে আকর ও ধাতুশালা। সব মিলিয়ে সম্বৃদ্ধিশালী দেশ এই কটাহ রাজ্য, প্রজাপালক রাজার পরিচালনায় সমাজ অনাহার ও দারিদ্র্য মুক্ত।

 

‘ভূজঙ্গ উপত্যকায় একটি ভারি সুন্দর জলপ্রপাত আছে, দেখতে যাবেন কি?’ ধনঞ্জয় এক সন্ধ্যায় প্রস্তাব করেন কুমার ও উল্মুকের কাছে।

‘জলপ্রপাত? সে তো অতি উত্তম প্রস্তাব, কিন্তু আমরা দুজনে পথ চিনে যেতে পারব কি?’ পুষ্পকেতু দ্বিধা প্রকাশ করেন।

‘আপনারা সম্মত থাকলে, আমি সঙ্গে যাব’।

‘কিন্তু আপনি ব্যস্ত মানুষ, তার ওপর এতজন অতিথি রয়েছেন’।

‘সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমার গৃহিণী অতি কর্মপটু, শ্রেষ্ঠী কন্যা তো। আমাকেও যেরূপ সুচারু ভাবে চালনা করেন তিনি, একদিনের জন্য অতিথিশালা পরিচালনায় আপত্তি হবেনা’।

‘তবে তো হয়েই গেলো, চলুন ঘুরে আসি’।

‘কাল প্রত্যুষে, রওয়ানা দেবো তাহলে, পর্বতমূল অবধি গোশকটে গিয়ে, বাকিটা পায়ে হেঁটে যেতে হবে। অপরাহ্নের মধ্যেই ফিরতে পারব আশা রাখি।‘ ধনঞ্জয় পরিকল্পনা বিস্তারে জানান।

 

উষার প্রথম আলোয় প্রকৃতি তখনও মায়াময়, ঘুমন্ত অতিথশালায় নিঃশব্দে প্রস্তুতি পর্ব চলছে দিবাযাত্রার। বেশ কিছু শুকনো খাবার, ফল ও পানীয় জল সাথে নিয়ে এক সেবক বসেছে শকটের সামনের ভাগে, চালকের পাশে। ধনঞ্জয়, পুষ্পকেতু ও উল্মুক বসবেন পিছনের ছাউনিতে। যানে উঠবার আগে কেতু অভ্যাসমত একবার বেলাভূমিতে যান, সূর্যোদয়ের প্রথম আভায় দিগন্ত তখন  আবির রাঙ্গা, সমুদ্র ধ্যানগম্ভীর। সেদিকে চেয়ে থাকেন তিনি কিছুক্ষণ, নিজের কাঁধে উল্মুকের হাতের স্পর্শ পেয়ে সম্বিত ফেরে তাঁর।

‘চল, এবার যেতে হবে যে!’

‘হ্যাঁ যেতে তো হবেই একদিন’, দীর্ঘশ্বাস ফেলেন কুমার নিজের অজান্তেই।

অতিথিশালায় ফেরার পথে দেখেন রোজকার মতই বেলা আর ধী দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের জন্য। বেলার হাতে আজ কিছু রয়েছে, কেতুকে দেখে হেসে হাত বাড়িয়ে দেয় সে। কুমার লক্ষ্য করেন তার হাতে রয়েছে একটি শামুকের মালা আর কঞ্চির চাঁচি দিয়ে বানানো ফুলের সাজ, বোধকরি মেয়েদের মাথায় পরার গয়না। মালাখানি ভারি যত্নে গাঁথা, রকমারি শামুকের সুষ্ঠ বিন্যাসে সেটি দেখতে অতি মনলোভা; মাথার গয়নাটিতেও নিপুণ হাতের ছোঁয়া বোঝা যায় সহজেই।

‘এ কি মাল্যদানের উদ্যোগ নাকি হে?’ উল্মুক খোঁচা দেন বন্ধুকে।

‘পরিহাস কোর না উল্মুক, কত ভালবেসে হয়তো নিজের সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদটি নিয়ে এসেছে আমাকে দেবে বলে ও’।

‘তুমি নেবে?’

‘হ্যাঁ, নেবো বৈকি; এ গহনা এমনই আর এক সরলা বালিকাকে দেবো, সে ভারি খুশি হবে পেয়ে’।

‘কার কথা বলছ তুমি?’

‘হৈম, হৈমন্তী’।

পুষ্পকেতু গহনাগুলি হাতে নেন পরম যত্নে, বালিকার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে নির্মল আনন্দে। কুমার নিজের আঙুল থেকে একটি মরকত খচিত অঙ্গুরীয় খুলে এগিয়ে দেন তার দিকে। প্রথমে দ্বিধাভরে হাতে নেয় সে আংটিটি, তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে পরম বিস্ময়ে, সূর্যের আলোয় ঝলকে ওঠে মণি সবুজবর্ণ আভায়।

পুষ্পকেতু ও উল্মুক যানে উঠবেন, এসময়ে ধী এসে দাঁড়ায় শকটের পাশে, কিছুদূরে দাঁড়িয়ে বেলা। কুমার হাত নেড়ে বোঝান কাল দেখা হবে আবার, শকট চলতে শুরু করে। ছেলেটি তখনও আসছে পিছু পিছু, নিজস্ব ভাষায় কিছু বলতে চেষ্টা করে সে।

‘ছেলেটি আপনার অনুগত হয়ে পড়েছে দেখছি, এরা জংলী ও স্বাধীনচেতা, তবে কাউকে পছন্দ হলে অসম্ভব আনুগত্য দেখায়’, ধনঞ্জয় বলে ওঠেন।

‘শকট থামাতে বলুন ভদ্র, ছেলেটিকে সঙ্গে নিতে চাই, নাহলে হয়তো সারাটা পথ এভাবেই সঙ্গে আসবে ও’, পুষ্পকেতু অনুরোধ করেন। অতঃপর ধীও সঙ্গী হয় পর্বত ভ্রমণে।

 

রাজপথ ধরে চলতে চলতে, ক্রমে মেঠো পথে নামে গোশকট, পর্বতমালার আঁকেবাঁকে এগিয়ে চলে সে পথ, পাশে পাশে সঙ্গে চলে ভূজঙ্গ নদী। দুপাশে ঘন সবুজ বনানী, যতদূর চোখ যায় শুধই পর্বত, চারদিক নির্জন, কত চেনা ও অচেনা পখির কুজনে বাতাস সচকিত। বুনো ফুল ফুটে রয়েছে গাছে গাছে, নাম না জানা রকমারি বৃক্ষসারি। অবশেষে এক জায়গায় গিয়ে শকট থামে, এখান থেকে পায়ে হেঁটে উঠতে হবে পাহাড়ে; সেবক পথ দেখিয়ে চলে আগে আগে, তার কাঁধের ঝুলিতে খাদ্য ও পানীয়। একটি সরু পায়ে চলার রাস্তা রয়েছে পাহাড়ের গায়ে, এগোতে অসুবিধা হয়না তাই।

‘এদিকে অনেক লোক আসে কি? বেশ পথের মত তৈরী হয়েছে দেখছি?’ পুষ্পকেতু ধনঞ্জয়কে প্রশ্ন করেন।

‘হ্যাঁ পাহাড়ের উপরে, জলপ্রপাত থেকে কিছু দূরে একটি শিব-পার্বতী মন্দির আছে, স্থানীয়রা সেখানে পূজা দিতে যায় বিশেষ বিশেষ দিনে, আবার মানতও করে কেউ কেউ, সেকারনেও যায়।‘

পথচলা শুরু হয় নিঃশব্দে, উঠতে হবে খাড়াই পথ, বাক্যালাপে শক্তিক্ষয় করতে আগ্রহী নয় কেউই। এরমধ্যে, ধী গাছের ডাল ভেঙ্গে লাঠি বানিয়ে সবাইকে দিয়েছে, লাঠির ভরসায় পথ চলা সহজ হয়ে যায় অনেকটাই। পথের ধারে ধারে ঝোপের মধ্যে ফুটে আছে অচেনা বুনো ফুল, তাদের যেমন রঙের বৈচিত্র তেমন অনেক গুলিরই ভারি মিষ্টি গন্ধ, এসব দেখতে দেখতে পথ চলেন কেতু অন্যমনে; এখনও যেন মেনে নিতে কষ্ট হয় তাঁর, স্বভূমি থেকে এতদূরে এক ভিন্নদেশে ভিন্ন পরিবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নিজের মত করে।

কেটে গেছে প্রায় তিনদন্ডকাল, অঘ্রানের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াতেও সকলের কপালেই শ্বেদবিন্দু; এসময়ে, যেন কিছুটা উপর থেকে ভেসে আসে এক নিরবিচ্ছিন্ন কোলাহল; তাকে ঝড়ের কলধ্বনি হিসেবেও চিহ্নিত করা চলে।

‘গন্তব্য বেশী দূরে নেই আর, জলের শব্দ শুনেছেন তো?’ ধনঞ্জয় বলে ওঠেন, সকলেই আশ্বস্ত হন একথায়। অবশ্য ধী একেবারে নির্বিকার, পথশ্রমে ক্লান্তির কোনও লক্ষণ নেই তার মুখের ভাবে।

অবশেষে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা দেয় জলরাশি, জলকণার ছিটে গায়ে এসে লাগে, ধাপে ধাপে কাছে এগিয়ে যেতে। সামনেই একটি পাথরের চাতাল প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠেছে, জলের ছাঁট এসে সেটি সিক্ত ও পিছল। সাবধানে সকলে সেখানে গিয়ে দাঁড়ান অবাক বিস্ময়ে, সামনে পর্বতগাত্র থেকে প্রচন্ড তেজে বেরিয়ে আসছে জলধারা, আর তা আছড়ে পড়ছে পুর্ণবেগে বহূ নীচের পাথুরে তটে। ক্রমাগত পিষ্ট হয়ে সে তট ক্ষয়ে একটি কটাহের আকার নিয়েছে। জলধারা সেই কটাহ পুর্ণ করে বয়ে যাচ্ছে আরো নীচে পাথরের গা বেয়ে।

‘কি অপূর্ব জলপ্রপাত, পুস্তকে পড়েছি এতদিন, দেখে চক্ষু স্বার্থক হোল আজ!’ উল্মুক বলে ওঠেন উচ্ছ্বসিত স্বরে।

‘কী অসীম শক্তি ওই জলধারার, তরলের আঘাতে পাথরও ক্ষয়ে গেছে, এ বড় শিক্ষার বিষয় বন্ধু’। পুষ্পকেতু মন্তব্য করেন গভীর মুগ্ধতায়।

জলপ্রপাতে কিছু সময় কাটিয়ে সকলে যাত্রা করেন আরও চড়াইয়ে, সেপথে কিছুদূরে গিয়ে পাথর কেটে তৈরী সিঁড়ি ধাপে ধাপে উঠে গেছে একটি মন্দিরের দেউড়িতে। মন্দিরটি আয়তনে খুব বড় নয়, একজন মাগধী পুরুষের চোখে তো নয়ই, তবে তার খিলান ও থামের কারুকার্য অতি সুক্ষ। মন্দিরের গঠন অনেকটা রথের মত, শুরুর নাটমন্দিরটির চারদিক খোলা। সেখান থেকে গর্ভগৃহে ঢুকে চোখে পড়ে প্রায় পাঁচহাত উঁচু শিবলিঙ্গ, বুনো ফুলের মালায় সাজানো। লিঙ্গের উপরের ছাদ থেকে ঝোলানো রয়েছে একটি রৌপ্যকলস, সে থেকে বিন্দু বিন্দু জল ঝরে পড়ছে লিঙ্গের উপর এবং ক্রমে প্রণালী বয়ে সে জল জমা হচ্ছে একটি ছোটকুন্ডে। গর্ভগৃহের ডানপাশে রয়েছি এরও একটি প্রকোষ্ঠ, সেটিতে দেবী চন্ডিকার পাথরের মূর্তি অধিষ্টিত আছে বেদীর ওপর। এই প্রকোষ্ঠটি দিনের আলোতেও প্রায় অন্ধকার, তাই একটি দীপদন্ডে জ্বলছে প্রদীপের সারি।

‘এখানে নিত্য পূজার ব্যাবস্থা রয়েছে দেখছি, পুরোহিত কি পর্বত পদমূল থেকে আসেন রোজ?’ পুষ্পকেতু জানতে চান।

‘না, এদেশের পাহাড়গুলি গূহাবহূল, প্রাকৃতিক ভাবেই গড়ে উঠেছে সেগুলি। বেশীরভাগ গুহা সৎকার কার্যের জন্য নির্দিষ্ট, তবে অনেকগুলি আবার রাজকার্যেও ব্যবহৃত হয়। তেমনি কয়েকটি গুহা আছে খুব কাছেই। সেগুলিতে থাকে কয়েকজন রাজকর্মী ও এই মন্দিরের পুরোহিত।‘ ধনঞ্জয় ব্যাখ্যা করেন।

‘রাজকর্মীদের কি কাজ এখানে?’ পুষ্পকেতু কৌতুহলী হন।

‘আরও একটু উপরে উঠলে কটাহ শিখর, এই পর্বতের চূড়া, সেখানে প্রতিদিন গোধূলিতে জ্বলে বিশাল অগ্নিকুন্ড, তার ব্যবস্থার জন্য কর্মীর প্রয়োজন। এছাড়া মন্দির রক্ষনাবেক্ষণ ও হিংস্রপ্রাণীর উৎপাত প্রতিরোধ করতে রয়েছে কয়েকজন বনকর্মী।‘

‘তাই ভাবি, এতটা বনপথ এলাম, অথচ ব্যাঘ্র তো দূরস্থান, একটি শৃগালও চোখে পড়ল না কেন?’ উল্মুক লঘু স্বরে বলে ওঠেন।

‘ব্যাঘ্রের অভাবে বড় উতলা হয়েছ বোধ হচ্ছে?’ পুষ্পকেতু বন্ধুকে উত্যক্ত করেন।

‘ব্যাঘ্রের দেখা পেলেই অধিক উতলা হতাম, তুমি এ নিয়ে ভেবোনা’।

‘আপনি সৎকার কার্যের কথা কি বলছিলেন ভদ্র?’ পাহাড় থেকে নামার কালে প্রশ্ন করেন পুষ্পকেতু ধনঞ্জয়কে।

‘এদেশের উচ্চবর্ণের মানুষ আর্যরীতি মেনে চলেন, তাই তাঁদের সৎকার হয় চিতায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ স্থানীয় লোকাচারে বিশ্বাসী, তারা মৃতদেহ গুহার মধ্যে রেখে আসে পাথরের ফলক দিয়ে তৈরী পেটিকায় ভরে। সেই সাথে মৃতের প্রিয় বস্তু সামগ্রীও রেখে আসে পরলৌকিক জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য।‘

‘এ তো ভারি অদ্ভূত রীতি!’ উল্মুক বিস্ময় প্রকাশ করেন।

‘কোনটা অদ্ভূত আর কোনটা সাধারণ তার বিচার করে কে? পাশ্চাত্য দেশেও পেটিকায় ভরে মৃতদেহ ভূমিস্থ করার রীতি শুনেছি। মিস্রদেশে শুনেছি মৃতদেহ রক্ষা করার আশ্চর্য ব্যবস্থা আছে।‘ পুষ্পকেতু ব্যাখ্যা করেন।

এরপর দুপুরের আহার শেষ করে পর্বত থেকে নামতে শুরু করেন অভিযাত্রীদের ছোট দলখানি। উপরে ওঠার থেকে নামায় শ্রম কম, তবে পদস্খলনের ভয় বেশী, অতএব সতর্কভাবে পথ চলেন সকলে। পথের মাঝে একটি জটলার সম্মুখিন হতে হয় তাঁদের, শান্ত পরিবেশ কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে জটলার প্রকোপে। পুষ্পকেতু কৌতুহল বোধ করেন, তাই ধনঞ্জয়কে অনুরোধ করেন বিষয়টা জানতে। ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢোকেন ধনঞ্জয়, পুষ্পকেতু ও উল্মুক তাঁর পিছু নেন। জটলার কেন্দ্রবিন্দু একটি গুহামুখ, তার সমুখের প্রশস্ত অংশ ঝোপঝাড় সরিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে সম্প্রতি, বোঝা যায় তা। সেই প্রশস্ত চাতালে একটি জোয়ান পুরুষ গুহামুখ আগলে বসে থাকতে চাইছে, আর তার সঙ্গীরা প্রাণপনে চেষ্টা করছে তাকে বাইরে টেনে নিয়ে যেতে। বেলা পড়ে আসছে, তাই ফেরার তাড়া সকলের, কিন্তু লোকটি যেন কোন উদগ্র আবেগে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত। ধনঞ্জয় ভীড়ের মধ্যে একজনকে প্রশ্ন করেন ঘটনার বিষয়ে।

‘লোকটির স্ত্রী মারা গেছে কাল রাতে, তাকেই সৎকার করতে এসেছিল এরা, কিন্তু এখন স্ত্রীর মৃতদেহ একা ফেলে ফিরে যেতে অসম্মতি জানাচ্ছে স্বামী, তাইতেই গোলমাল’, ধনঞ্জয় ব্যাখ্যা করেন।

‘অসম্মতির কারণ কি?’ প্রশ্ন করেন কুমার।

‘লোকটি বলছে, একলা গুহায় ভয় পাবে তার স্ত্রী, একা রাত্রিবাস করেনি সে জীবনে। বিচিত্র মানুষের শোকের বহিঃপ্রকাশ!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ধনঞ্জয়। এরপর বাকী পথ নীরবে পার করেন সকলে, অজানা ব্যক্তির শোক বুঝি ছায়াচ্ছন্ন করে তোলে পরিবেশ। গোশকটে আরোহনের পরেও উল্মুক অসম্ভব রকম নিশ্চূপ হয়ে থাকেন, পুষ্পকেতু লক্ষ্য করে উদ্বিগ্ন বোধ করেন মনে মনে।

রাত্রি গভীর, নিঝুম চারিধার, শুধু কান পাতলে ঢেউয়ের শব্দ শোনা যায়, এমনই নিস্তব্ধ পরিবেশ। তবু কোনও অস্পষ্ট শব্দে নিদ্রাভঙ্গ হয় পুষ্পকেতুর; চোখ খুলে বুঝতে চেষ্টা করেন তিনি কক্ষের পরিস্থিতি। অন্ধকার সয়ে এলে অদূরে জানালার কাছে একটি ছায়ামূর্ত্তি চোখে পড়ে; চাঁদের নরম আলোয় লক্ষ্য করেন উল্মুককে, একজোড়া মুক্তাখচিত কঙ্কন হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছেন তিনি আকাশের পানে চেয়ে। নীরবে চোখ বোঝেন আবার পুষ্পকেতু, বিরহী প্রেমিকের একান্ত শোকের ক্ষণে বাধ সাধতে মন চায় না তাঁর।

***

যাত্রার দিন স্থির হয়ে গেছে, আগামীকাল প্রত্যুষে নৌবহর পাড়ি দেবে মালব প্রণালী বেয়ে কাটিগার বন্দরে। অতিথিদের গোছগাছ সব শেষ হয়েছে, সামনে নতুনের হাতছানি, তবু যেন মনের কোনায় সুক্ষ বেদনার রেশ অনুভব করেন পুষ্পকেতু। মালবদ্বীপের এই বালুতট, রোজকার সূর্যোদয়, বেলা, ধী, যেন এক অদৃশ্য মায়ার বাঁধন; ছেড়ে যেতে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়। বহূচেষ্টাতেও আজ কিছুতেই বিদায় নিতে পারেননি ছেলে মেয়ে দুটির কাছে, এক অপরাধ বোধ পীড়া দিচ্ছে মনকে সেকারণে।

‘যাত্রায় বিঘ্ন ঘটেছে, আপনাদের নাও রওয়ানা দেবে কাল নয়, পরশু’, দুপুরে আহারের সময় ধনঞ্জয় এসে সংবাদ দেন।

‘এরূপ বিলম্বের কারণ কিছু জানেন কি?’

‘আপনাদের বহিত্রটির কয়েকজন নৌকর্মী কাল শুন্ডিগৃহ থেকে ফিরে অবধি ভেদ বমি করছে; দূরের পথ অসম্পূর্ণ কর্মীদল নিয়ে যাত্রা করা বিপজ্জনক, তাই এই বিলম্ব।‘

‘একদিনেই সুস্থ হবে তারা, এমনই আশা করেন অনঘবর্মা?’

‘না, সেরকম দূরাশা নেই তাঁর মনে; বন্দর থেকে কয়েকটি স্থানীয় মাল্লা পরিপূরক হিসাবে নেওয়ার কাজ চলছে, আশা করা যাচ্ছে কালকের মধ্যে সকল শূন্যস্থান পূরণ করা যাবে। তাতেই পরশু যাত্রার ব্যবস্থা।‘

‘অসুস্থ লোকগুলির কি হবে?’

‘কি আর হবে, সুস্থ হলে কোনও একটি স্বদেশগামী মাগধী নৌকায় স্থান পাবে তারা; সেকারণেই বিদেশে পরিচয় পত্র এত প্রয়োজনীয়।‘

‘আমরা চলে যাচ্ছি কাল, ভালো থেকো তোমরা’, কথা কটি বুঝিয়ে বলতে গিয়ে কন্ঠস্বর ভিজে ওঠে পুষ্পকেতুর, সরল ছেলে মেয়ে দুটি তাকিয়ে থাকে অবাক চোখে, হয়তো বোঝে নি তাঁর বক্তব্য।

‘মায়া বাড়িয়ে আর লাভ কি? চলো বেলা হোল’, উল্মুক তাড়া করেন অতিথিশালায় ফিরতে, রোদের তাপ বাড়তে শুরু করেছে ততক্ষণে। বেলা হেসে বিদায় জানায় তার অভ্যস্ত ভঙ্গীতে, ধী গম্ভীর ভাবে চেয়ে থাকে।

দিবা প্রথম প্রহরের দুইদন্ড কেটে গেছে, সূর্যরশ্মি তখনও নরম, পূজার্চনা শেষে বহিত্রে আরোহন করছেন সকলে একে একে। পুষ্পকেতু ডিঙি নৌকায় চড়তে যাবেন, জলে একটি পরিচিত ছায়া দেখে চমকে ফিরে তাকান। ধী দাঁড়িয়ে আছে নৌকার একপাশে, তার পিঠে একখানি ফাঁপা বাঁশের লাঠি ও কাঁধে চামড়ার লম্বাটে ঝোলা, যেন কোথাও যাবার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে সে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে বেলা হাসিমুখে হাত নাড়ছে, তার গলায় সুতায় ঝুলছে মরকতমণির অঙ্গুরীয়, রক্ষা-কবচের মত।

‘এ হয় না ধী, তুমি ফিরে যাও, পথে অনেক বিপদ! তোমার পিতার অনুমতি বিনা আমি সঙ্গে নিতে পারিনা তোমায়’।

‘কুমার, ওরা আমার সাথেই এসেছে; ওদের পিতা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল অতিথিশালায়, আপনারা রওয়ানা দিয়েছেন ততক্ষণে। ধী সমুদ্রযাত্রায় সঙ্গী হতে চায় আপনার, ফেরার পথে রেখে যাবেন আবার এদেশে এমনটাই ইচ্ছে তার।‘ ধনঞ্জয় বলে ওঠেন পাশ থেকে।

‘এত বড় দায়িত্ব কেমন করে নিই ভদ্র, ধী কিশোর বই তো নয়!’

‘আপনি আপত্তি করলেও শুনবে বলে মনে হয় না ও, বড় একরোখা হয় এরা’ হেসে বলেন ধনঞ্জয়।

অতঃপর অনুগত ভক্তের মত নিঃশব্দে সঙ্গী হয় ধী, সমুদ্রযানে পৌঁছে অনঘবর্মাকে বুঝিয়ে বলেন পুষ্পকেতু। আবার শুরু হয় সাগরযাত্রা মালবপ্রণালী বেয়ে, এবার গন্তব্য শৈলদেশের কাটিগার বন্দর।

***  ***

দুরূহ শব্দের অর্থঃ

স্বর্ণজ – টিন, মরকত – পান্না, মিস্রদেশ – মিশর

শেয়ার করতে:

You cannot copy content of this page