উপন্যাস।। আবার এসো ফিরে।। রামেশ্বর দত্ত

ঈশ্বরচন্দ্রের এবার ইচ্ছে, রাতের ইশকুল শুরু করবেন। তাতে রাখাল বালকদের পড়াবেন। দিনের কাজ ছেড়ে তারা তো পড়তে আসছে পারছে না, তাই কাজ শেষে তারা আসবে। পড়বে। তাদের ইশকুলের নাম দেবেন রাখালদের ইশকুল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর একলার পক্ষে টানা সম্ভব নয়তাই একজন শিক্ষক নিযুক্ত করবেন। মাস মাইনে দশ টাকা। এখানেও অভিরাম হল তাঁর উদ্ধারকর্তা। সেই বাঙালিটোলা থেকে এক বাঙালি বাবুকে ধরে পাকড়ে নিয়ে এল। পড়ালেখা জানা মানুষ। নাম বললেন, বিভূতি ভট্টাচার্য। ঈশ্বরচন্দ্র তাঁকে কাজে বহালি করে নিলেন।

এরপর…

পর্ব-২৭ 

  সকালে দাতব্য চিকিৎসালয়। দিনে বালক বালিকদের ইশকুল আর সন্ধ্যেবেলা রাখালদের ইশকুল। এই নিয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের দিনগুলো কাটছে। তিনি এখন কারোও বাবু, কারোও দাদা, কারোও পণ্ডিতমশাই, কারোও কাছে বা বিদ্যাসাগর নামে সম্বোধন পাচ্ছেন। সঙ্গে খ্যাতির অভাব হচ্ছে না। সাঁওতালি যুবক যুবতীরা তো তাঁকে পিতার সমান দেখছে। নিজের বাবার কাছে যেমন আদর আবদার চলে, তেমন ঈশ্বরচন্দ্রের কাছে এসেও তারা করে।

একদিন সকালবেলা। কাজে সেদিন ছুটি। ঈশ্বরচন্দ্র আর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দুজনে বাড়ির বারান্দায় বসে রয়েছেন। শাস্ত্রীমশায় দেওঘরে কিছুদিনের অস্থায়ীবাস সেরে কর্মাটাঁড়ে এসেছেন বন্ধুর কাছে। সেখানেও দিনকতক থাকবেন।

গ্রামের পথ দিয়ে যেতে যেতে একজন মানুষ হাতে পাঁচ-ছখানা ভুট্টা নিয়ে সটান ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়িতে ঢুকে পড়ল। দুজনে বসে তা দেখলেন। ঈশ্বরচন্দ্র জানেন, কী তাদের উদ্দেশ্য। তবে শাস্ত্রীমশায়ের তা অজানা। তিনি কিছুটা অবাক  হয়ে দেখেত থাকলেন। মানুষটা আবদার করে বসল, বাবুকে তার এই ভুট্টোগুলো কিনে নিতে হবে।

ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, ওরে, এত ভুট্টা নিয়ে আমি কী করব রে?

সে কথায় কান না দিয়ে লোকটা বলতে থাকল, তুই এটা নিয়ে এক গণ্ডা পয়সা দিলে আমি ছেলেটার চিকিচ্ছে হবে।

ঈশ্বরচন্দ্রের কী মনে হল, তাকে এক গণ্ডা পয়সা দিয়েই ভুট্টাগুলো নিয়ে নিলেন। হরপ্রসাদ ব্যাপারটা দেখলেন। কিছু বললেন না। কথা চলতে থাকল।

কিছুক্ষণ পরে এক যুবতী এসে একই আবদার করল। তার হাতে ভুট্টা বেশি সংখ্যায় ছিল। সে চাইল আট আনা। ঈশ্বরচন্দ্র তাই দিলেন। ভুট্টাগুলো কিনে নিয়ে ঘরের তাকে আগের ভুট্টাগুলোর সঙ্গে রেখে এলেন। হরপ্রসাদ এবারও দেখলেন। অবাক লাগছে তাঁর। তবে চুপ করেই রয়েছেন।

এরপরে যখন আর একজন ভুট্টা হাতে এসে একই কথা বলল, এবং ঈশ্বরচন্দ্র তা নেবার উদ্যোগ করছেন, হরপ্রসাদ বলে উঠলেন, তুমি করছ কী? এত ভুট্টা দিয়ে কী হবে?

-তুমি আছো তো হর, দেখোই না কী হয়।

এই করে প্রায় জনা আটেকের থেকে ভুট্টা কিনে ঘরের কাঠের তাক ভরে ফললেন । পরে ব্যপারটা ভুলে গল্পে মেতে গেলেন।

বেলা বাড়লে দুজনে  উঠে গিয়ে স্নান করলেন। অভিরাম খাবার বাড়ছে। খেতে বসবেন।  এমন সময় একজন দুজন করে সেই লোকগুলো ফিরে এলো ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়িতে। ভিড় করে দাঁড়াল সামনে খোলা জায়গাটায়। তাদের প্রত্যেকের এক হাতে একটা পাতা, অন্য হাতে গাছের শুকনো ডালপালার আঁটি। এবার তাদের আবদারের বাক্য হল,  বিদ্যাসাগর, বড্ড খিদে পেয়েছে, তুই আমাদের খেতে দেয়ে।

নিজেদের খাওয়া  মাথায় উঠল। ঈশ্বরচন্দ্র হাসলেন। বন্ধুকে ডেকে নিলেন। বললেন, চলো, ভুট্টাগুলো সব বার করে নিয়ে আসি।

-মানে?

হরপ্রসাদ প্রশ্ন করলেন; সাথে সাথে বন্ধুর কথা মতো কাজও সমাধা করলেন।  বাইরের লোকগুলোকে দেখিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র তাঁকে বললেন, ওদের হাতে এক একটা ভুট্টা দাও, ওরা এখন ওইগুলো পুড়িয়ে খাবে।…আমাদের জঠরের জ্বালা আছে, আর ওদের তা থাকবে না? ওরাও তো জীব। জীব মাত্রেই ক্ষিদে হয়; খেতে হয়…

-তাহলে ওদেরকে যে পয়সা দিলে?

শাস্ত্রীমশাই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন। ঈশ্বরচন্দ্র উত্তর দিচ্ছেন, প্রথমেই শুনলে না, এক গণ্ডা পয়সা দিয়ে ওর ছেলের চিকিচ্ছে করবে…, আরে বাবা, আমি একজন চিকিৎসক বসে থাকতে…, ও সবই জানে, তবে কী জানো, এরা অভাবী ঠিকই, তবে স্বভাবে খুব ভালো। দরকারে এক-দুটো অসত্য বলে ফেলে।

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন ঈশ্বরচন্দ্র। পরে বললেন, চলো, ওরা খাওয়া দাওয়া করুক; আমরাও…

 

দিন কাটছিল ভালই। এরই মাঝে একদিন কলিকাতা থেকে সুসংবাদ এলো, এ বছর এফ এ পরীক্ষায় এক ছাত্র মেট্রোপোলিটান ইন্সটিটিউশান থেকে গুণানুসারে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। সংবাদ শুনে ঈশ্বরচন্দ্রের কী আনন্দ! উল্লাসে ফেটে পড়বার অবস্থা। ভাবলেন, এতদিনে তাঁর হাড়ভাঙা খাটুনি, সঙ্গে অজস্র অর্থব্যয় সার্থক হল।

ধনুরভাঙা পণ করেছিলেন, তাঁর স্বপ্নের ইশকুলে এফ এ, বি এ পড়াবার অনুমতি তিনি আদায় করে প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীভূত করবেন। তা যখন হল, তাঁর মনে সংশয় জন্মেছিল, ছাত্ররা  সেখানে পড়ে পাশ করবে তো? তা, এখন তো দেখছেন, শুধু পাশই নয়, পরীক্ষার্থী সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে  দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে কলেজের নাম উজ্জ্বল করেছে! প্রমাণ করেছে, প্রেসিডেন্সি, হিন্দু কলেজের ছাত্রদের থেকে তারাও কিছু কম নয়।

এ অবস্থায় আর কি তিনি কর্মাটাঁড়ে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেন? ট্রেন যোগে কলিকাতার পথে পাড়ি জমালেন। হাওড়ায় পৌঁছিয়ে পাল্কী ভাড়া করলেন। ভগ্ন শরীর। তাতে কী? এই নিয়েই তিনি কলেজে পৌঁছবেন; সেই কৃতী ছাত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, তাকে যথার্থ উপহার প্রদান করবেন।

এখন বাদুরবাগানে ঈশ্বরচন্দ্র নিজের বাড়ি করছেন। ২৬ নং বৃন্দাবন মল্লিক লেন। সুকিয়া স্ট্রীটের কাছে। বিশাল বাড়ি বানাচ্ছেন। দুতলা হবে। এখন একতলা হয়েছে। সেখানেই তাঁর বাস ।

দীর্ঘ পথশ্রমে কলিকাতায় পৌঁছলেন। কিন্তু বাড়ির দিকে গেলেন না। পাল্কির বেয়ারাদের বললেন, প্রথমে ঝামাপুকুরে চলো।

ঝমাপুকুরে ছাত্রের বাড়ি। সেখানে পৌছিয়ে দোরগোড়া থেকে হাঁক পাড়লেন, যোগেন, ও যোগেন…

কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সম্মানীয় শিক্ষক পরমারাধ্য বিদ্যাসাগরের গলা পেয়ে যোগেন বেরিয়ে এলো। সঙ্গে তার পিতা, বসুমহাশয় আসলেন। সশরীরে এমন ব্যক্তিকে নিজের বাড়িতে দেখে ছাত্র, ছাত্রের পিতা, দুজনেই অবাক! তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল উভয়ে। আশীর্বাদ জানালেন ঈশ্বরচন্দ্র।

বাড়ির ভিতরে তখন অনুষ্ঠান চলছে। পরীক্ষায় যোগেনের উৎকৃষ্ট ফল লাভে বাড়ি বয়ে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব একত্র মিলিত হয়ে আনন্দানুষ্ঠান করছে। বসুমশায় তারই মাঝে ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়ে গিয়ে বসালেন।

থালা ভর্তি জলযোগের ফল, মিষ্টি, নোনতা এলো। সেসব দেখে ঈশ্বরচন্দ্র হা হা, করে উঠলেন, এসব কিছুই তাঁর চলবে না। পেট রোগা মানুষ তিনি।

‘খান, খান’ করে, কিছু ফলাহার করানো গেল তাঁকে। তিনি আর দেরী করলেন না। উঠে পড়লেন। ছাত্রকে বললেন, একদিন আমার বাড়িতে আয়। আমার কাছ থেকে তোর বিশেষ পারিতোষিক পাওয়ার আছে।

যোগেন নতমস্তকে জানাল, শীঘ্রই সে যাবে। ঈশ্বরচন্দ্র বেরিয়ে এলেন। এরপর যেদিন যোগেন্দ্রনাথ তাঁর বাড়ি গেল, তিনি তাকে হাত ধরে নিয়ে গেলেন নিজের পাঠাগারের ঘরে। ঘর আলমারি আলমারিতে ভরা। তাতে রাশি রাশি পুস্তক। নিজের রচিত বহু পুস্তক। বইয়ের গায়ে গায়ে নাম লেখা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।  কিছু বা অন্য রচনাকারের পুস্তক। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত ভাষার পুস্তক। সেরকই একটা আলমারির সামনে যোগেনকে নিয়ে দাঁড় করালেন।

আলমারি খুললেন। ইংরেজি পুস্তক আর বিভিন্ন জার্নাল ভরা আলমারিখানা। বেশিভাগ বিদেশ থেকে আনানো। পুস্তকের রাশি থেকে বার করলেন কয়েকখানা অতি সুসজ্জিত বই। সোনার জলে নাম লেখা। সুবর্ণ-লতাপাতা-মন্ডিত উৎকৃষ্ট রূপে বাঁধানো। স্যার ওয়াল্টার স্কটের সমগ্র ওয়েভারলি উপন্যাসাবলী। ছাত্রের হাতে সেগুলো তুলে দিলেন।

এমন বহুমূল্য উপহার পেয়ে যোগেন্দ্রনাথ খুশি হয়ে তা মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করল। ঈশ্বরচন্দ্রের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম সেরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, স্যার, আমরা ছাত্ররা আপনার কাছে বহুভাবে ঋণী। মনে পড়ে স্যার, যেদিন কলেজ ছাড়ার জন্যে ছত্ররা গোলমাল করছে, আপনি আমাদের জনে জনে ডেকে জিজ্ঞেস করলছিলেন, তোরা, কে, কে আমার কলেজে থাকবি, কে কে অন্য কলেজে চলে যাবি, হাত তোল। সেদিন আমরা ক’জন বলেছিলাম, আমরা কোথাও  যাব না। আমরা পাস হই পাস, ফেল হই ফেল, এখানেই থাকব, অন্য কোথাও যাব না। তখন আপনিই আমাদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, তোদের জন্যে আমার কি ভাবনা নেই, অন্য কলেজে পড়লে যেমন পড়া হবে, এখানেও যাতে তা হয়, সে পক্ষে কোনও অভাব হবে না, তোরা লোকের কথায় নাচিস না।…আজ স্যার বলতে দ্বিধা নেই, আপনি আপনার কথা রেখেছেন। আমরাও তার প্রতিদান দিয়ে আপনার প্রচেষ্টাকে সফল করেছি। এতে আমাদেরও কি কম আনন্দ হচ্ছে?

যোগেন্দ্রনাথের কথা শুনতে শুনতে ঈশ্বরচন্দ্রের মন সুখের আতিশয্যে কানায় কানায় ভরে গেল। চোখের কোল ভিজে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, আর বোধ হয়, বেশিক্ষণ নিজেকে এভাবে ধরে রাখতে পারবেন না।

যোগেন্দ্রকে তাড়াতাড়ি বিদায় দিয়ে নিজে একটা চেয়ার ধরে বসে পড়লেন। অনুচ্চারিত শব্দে বলতে থাকলেন, দেখো মা, আমি পেরেছি, আমি পেরেছি…

পড়ুন – আবার এসো ফিরে-পর্ব(২৫)  

কলিকাতায় যখন একবার এসেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র স্থির করলেন, এখানে এখন কিছুদিন থেকে বাকি কাজগুলো সমাপ্ত করে ফেলবেন। তালিকার প্রথম কাজটা মনে হতেই মেজাজটা খিঁচরে গেল। তাই তার ক্রমণিকা পিছিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় দফায় করা মনস্থ করলেন।

প্রথমে চাইলেন, বীরসিংহে নিজের এবং ভাইদের পৃথাগ্ন করবেন। মাঝে মাঝেই সেখানে অশান্তি হচ্ছে। অশান্তি ঘটিবাটির নয়; অশান্তি হচ্ছে সংসারে কাজের, যৌথ খরচের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে। খরচের বেশিটাই তাঁর দ্বারা পূরণ হচ্ছে, অথচ তাও দীনময়ীর অভিযোগ পত্র আসছে, ঠাকুরপোরা নানান কথা তুলছে। ভাই-ভাজদের মধ্যে আর সেই আগের মতো সদ্ভাব নেই। ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে তাদের মাঝে কথা চালাচালি, বাগ বিতণ্ডা, বিবাদ হচ্ছে।

ঈশ্বরচন্দ্র ভাবলেন, প্রত্যেকেরই সন্তানরা বড় হয়েছে। তারা তাদের মা, বাবাকে এমন কূটকচালি করতে দেখলে, নিজেরা কী শিখবে? নিজের দুই মেয়ের এখনও বিবাহ দেওয়া বাকি। তারা বাড়িতে রয়েছে। দীনু, শম্ভু, ঈশান, তাদের ছেলেমেয়েরাও রয়েছে। এরপর ভাইবোনদের মাঝেও ওই রোগ এসে উপস্থিত হবে। তখন?…তার থেকে, এটাই উপযুক্ত সময়, ভাই-ভাইয়ের  হাঁড়ি আলাদা করে দেওয়া। এর জন্যে দরকার প্রত্যেকের আলাদা বাস। বাসস্থান আলাদা হলে, কাছাকাছি, পাশাপাশি থাকবে। নিজের নিজের সংসার নিজে সামলাবে। তাতে না আসবে কাজের ভাগ বাটোয়ারা, না আর্থিক বিষয়ে মন কষাকষি। নিজেদের মধ্যে সদ্ভাবও থাকবে।

তিনি নিজে তো আর বীরসিংহ গ্রামে যাবেন না। ভাইদেরকেই কলিকাতায় ডেকে পাঠালেন। তাঁরা এলেন।  আলাদা বসতবাটির প্রস্তাব রাখলেন তাদের সামনে। এবার যা হয়। প্রশ্ন উঠল, টাকা কোথায় নিজের নিজের বাড়ি বানাবার? –আমি টাকার জোগান দোবো। কাজটা তোরা করবি, ঈশ্বরচন্দ্র বলে উঠলেন।

দাদার এ কথায় ভিতরে ভিতরে তারা খুশী হলেও বাইরে দেখাল, সংসার আলাদা করতে কতই যেন দুঃখ তাদের। মুখ শুকনো করে রাখল।

শেয়ার করতে:

You cannot copy content of this page