উপন্যাস।। আবার এসো ফিরে।। রামেশ্বর দত্ত

 উত্তরপাড়ার সীমানা শেষ হলএল বালি গঙ্গা তখন কিছুটা দূরে সরে গেছে। গাড়ি পথ অতিক্রম করছেসামনেই পথ বাঁক নিয়েছে ফিটন গতি কমিয়ে পথের বাঁক পেরোলো। কিন্তু বগী গাড়ি চলল তার পূর্ব গতিতে।

  আর যায় কোথায়? বাঁকে বগিগাড়ি নিজের ভারসাম্য হারিয়ে আরোহী শুদ্ধু উল্টিয়ে পড়লঘোড়াও পড়ল মুখ থুবড়েঈশ্বরচন্দ্র আর চালক ছিটকে গিয়ে পড়ল রাস্তার ওপর। তাদের প্রায় মাথার সামনে শায়িত ঘোড়ার অবস্থানমাটিতে পড়ে সে বেচারা পিছনের পা দুটো ভীষণ ভাবে ছিটকচ্ছে; মাটি ছেড়ে ওঠাবার জন্যে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে যে কোনও মুহূর্তে লোহার নালশুদ্ধু ঘোড়ার লাথি ঈশ্বরচন্দ্রের মাথায় আঘাত

হানতে প্রস্তুত ।

পর্ব- ২০

পথচারীর ভিড় জমে গেল। ছেলে মধ্যবয়স্ক, বুড়ো করে একগাদা লোক জড়ো হয়েছে। অথচ কেউ এগিয়ে আসছে না  দুর্ঘটনাগ্রস্তদের বাঁচাতে। বীরপুঙ্গবের দল। দাঁড়িয়ে আহা, উহু করছে।

হঠাৎ কী মনে হয়েছে মিস মেরীর।  গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়েছেন। পিছনের গাড়ির অবস্থা দেখে তাঁর চক্ষু স্থির। চিৎকার করে উঠলেন, এ্যক্সিডেন্ট…, স্টপ স্টপ।  টার্ন দ্যা কার্ট।

গাড়ি ঘুরে এসে দাঁড়াল ঈশ্বরচন্দ্রের সামনে।  লাফ দিয়ে নামলেন।  দৌড়লেন। পিছনে এ্যটকিনসন এবং উড্রে। তাঁরাও লাফিয়ে নেমে পড়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র রাস্তার ওপর চিত হয়ে শুয়ে । সাহেবরা প্রথমেই ছুটল ক্ষেপে ওঠা ঘোড়াকে সামলাতে। বুঝল, এ না করলে যে কোনও মুহূর্তে ঘোড়ার পায়ের আঘাতে ঈশ্বরচন্দ্রের জীবন হানি হতে পারে।

কসরৎ খাটাল।  চেষ্টা করে ঘোড়াকে তুলে দাঁড় করাল। ঘোড়া শান্ত হল।  মেরী ততক্ষণে পথের ধুলোয় বসে পড়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্রের মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়েছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বেহুশ। হাত মুখ কেটে রক্ত ঝরছে। মেরী নিজের রুমাল ছিঁড়ে ক্ষতের রক্ত বন্ধ করবার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ্যটকিন্সন ছুটলেন, জলের খোঁজে। সম্ভব হলে গরম দুধও নিয়ে আসবেন, পথের ধারের কোনও দোকান থেকে। মেরী সেরকমটাই বলে দিয়েছে।

সেবা শুশ্রূষা চলল। জ্ঞান ফিরল ঈশ্বরচন্দ্রের। পেটে হাত দিয়ে বোঝালেন, ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। উপায়?

–আপনি কি কলিকাতা পর্যন্ত স্থির থাকতে পারবেন?  এ্যটকিনসন জানতে চাইলেন।

-পারব। ঈশ্বরচন্দ্র উত্তর দিলেন। পরে বললেন, আমাকে বাড়ি পৌছিয়ে দিন।

কোনোক্রমে কলিকাতায় মেছুয়াবাজার স্ট্রিটের বাড়িতে এনে তোলা হল তাঁকে। খবর গেল সুকিয়া স্ট্রীটে, রাজকৃষ্ণবাবুর কাছে। ঈশ্বরচন্দ্রের হিতাকাক্ষী রাজকৃষ্ণ ছুটে এলেন। মেছুয়াবাজার স্ট্রীটের বাড়িতে ঈশ্বরচন্দ্র একলা থাকছিলেন। রাজকৃষ্ণ  তাঁকে নিয়ে চললেন সুকিয়া স্ট্রীটে। নিজের বাড়িতে।  গাড়ি পাঠিয়ে ডাক্তার ডাকালেন। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার। উভয়ের পরিচিত ডাক্তার। তিনি এলেন। রোগীকে পরীক্ষা করলেন। যন্ত্রণা উপশমের জন্যে ওষুধ দিলেন। শেষে নিদান দিলেন, এক মাস শুয়ে থাকবার। চিকিৎসা চলবে।

-বলো কী ডাক্তার! এক মাস! ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর বেদনার কথা ভুলে আঁতকে উঠলেন একমাস কথাটা শুনে।

-তাতেও কি  রক্ষা পাবেন, বিদ্যাসাগর মশাই? অঙ্গের ক্ষতি হয়েছে। এ কিন্তু আপানাকে সুদূর বিপদের বার্তা দিয়ে রাখল।

-হলটা কি?

-আপনার যকৃতটি উল্টো হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

-সেকি! উপায়?

-আপাতত ওষুধ চলুক। পরে ভাবনাচিন্তা করে দেখা যাবে।

ডাক্তার ফিরলেন। এ্যটকিনসন এবং উড্রে আগেই বিদায় নিয়েছিলেন। মেরী কারপেন্টার এতটা সময় ঈশ্বরচন্দ্রের পাশে থেকে সব শুনছিলেন। বাংলা ভাষা বোঝেন না। উৎসাহ নিয়ে জানলেন।  আপশোশ করলেন, আইএম স্যরি, মিঃ ঈশ্বরচন্দ্র। হোয়াট এ্য গ্রেট সাফারিং ফর উ্য।

ঈশ্বরচন্দ্র কপালে হাত ঠেকিয়ে ইঙ্গিতে জানালেন, সবই ভাগ্যের দোষে।

এরপর যা হবার, তা ছিল মিস কারপেন্টারের ইচ্ছামাফিক কাজ করা। এদেশে তিনি এসেছেন নারীশিক্ষার বিস্তারের ইচ্ছে নিয়ে। সেখানে তাঁর অভিপ্রায়, মেয়েদের শিক্ষা দান করুক মেয়েরাই। তার জন্যে ইশকুল গড়ে সেখানে বয়স্থা মহিলাদের শিক্ষদানের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। অর্থাৎ টিচার্স ট্রেনিং দেওয়া। ঈশ্বরচন্দ্র সেখানে বাধ সাধলেন। তিনি নারীসুহৃদ ব্যক্তি বটে । মিস কারপেন্টারের মাতৃসুলভ ব্যবহারে তাঁর হৃদয় কেঁদেছে। শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করেছেন। তাই বলে, তাঁর সব প্রস্তাবই যে মেনে নিতে হবে, এমন মানুষ তিনি নন।

ঘটনা হল, মিস কারপেন্টার প্রস্তাব তুললেন, বেথুন স্কুলে স্বতন্ত্র ভাবে কতকজন দেশীয় মহিলাকে শিক্ষা দিয়ে তাদের শিক্ষয়িত্রী বানানোর । ইংরেজ শিক্ষয়িত্রীর পরিবর্তে তারাই কাজ করবে। স্কুল ছাত্রীদের শিক্ষাদান করবে। একটা আলোচনা সভারও বন্দোবস্ত করলেন কারপেন্টার। ঈশ্বরচন্দ্রকে সভায় আসবার আহ্বান জানালেন। তিনি তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি।  জানিয়ে দিলেন। অনিচ্ছাকৃত কারণে গরহজির রইলেন সভায়।

সভা অনুষ্ঠিত হল। সভায় যোগ দিলেন, বাংলার লেফট্যানেন্ট গর্ভনর, স্যার উইলিয়াম গ্রে, শিক্ষাদপ্তরের অধিকর্তা মিঃ সিটনকার, মিঃ এ্যটকিনস। আমন্ত্রিত হলেন, দেশীয় বিদগ্ধজনেরা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন, কেশবচন্দ্র সেন, এম এম ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। সভায় মিস কারপেন্টারের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হল। দীর্ঘ আলোচনা। প্রস্তাব উত্তম। পাস হল। অনুমোদনের জন্যে তা গেল স্যার গ্রে’র কাছে। যদিওবা তিনি সভায়  ওই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলেন, তবু কী মনে হল তাঁর, তিনি তা পাঠালেন ঈশ্বরচন্দ্রের কাছে। নারীশিক্ষা বিষয়ে অনেকের মতো গভর্নরও ঈশ্বরচন্দ্রের মতামতকে গুরুত্ব দেন। নোট লিখে দিলেন, কাইন্ডলি পেরুজ এন্ড প্লীজ অফার ইওর ভ্যালুড অপিনিয়ন।

সভায় গৃহীত প্রস্তাব অতি মনোযোগ দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র পড়লেন। প্রস্তাব এবং সিদ্ধান্ত দেখে তিনি কিছুটা বিস্মিত হলেন। ভাবলেন, সভা তো ছিল ব্রহ্মসমাজে । সেখানে যে সরকারী ভাবে প্রস্তাব নেওয়া হবে, তা তাঁকে আগে জানানো হয়নি। জানলে, অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি সেখানে উপস্থিত থাকতেন। এধরণের প্রস্তাবে আপত্তি করতেন।

সিদ্ধান্তের শরিক হওয়া তো দূরের কথা। কলম তুলে নিলেন। গভর্নরের নোটের নীচে খসখস করে ইংরেজিতে লিখে চললেন, -প্রস্তাব পড়ে দেখলাম। এ বিষয়ে নিম্নে আমার মত প্রদান করলাম,

এ ধরণের কাজে অবশ্যই বয়স্কা মহিলাদের প্রয়োজন।  দেশে দশ-এগারো বছর পার না হতেই মেয়েদেরকে বিবাহ দেওয়া হচ্ছে।  তাদের জীবন বাড়ির ভিতরেই বন্দী হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সেই সব মেয়েদের প্রশ্ন আসছে না।  আসতে হলে, হবে বয়স্থা মহিলাদের। তাঁরা যদি এগিয়েও আসে তো তাঁদের হতে হয় আত্মীয়স্বজন শূন্য। অসহায় বিধবা।  এমন মহিলারা ঘর ছেড়ে বাইরে আসলে লোকের মনে আপনা আপনি নানা প্রকার সন্দেহ ও অবিশ্বাস দানা বাঁধবে। তা দ্বারা সরকারের এই সাধু উদ্দেশ্য সহজেই  বিনষ্ট হবে। তবে, আমি একটা বিষয়ে আপনার সঙ্গে সহমত পোষণ করছি। বেথুন স্কুলের জন্যে যে পরিমাণ সরকারী অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তার ফল আশানুরূপ পাওয়া যাচ্ছে না। একথা স্বীকার করেও অনুরোধ করব, যেহেতু বেথুন স্কুল ইংরেজদেরই পূর্বসূরি ভারতে স্ত্রীজাতির জ্ঞানোন্নতির চিহ্নস্বরূপ পরলোকগত মিঃ বেথুনের নামাঙ্কিত, তাই তা যেন কোনও প্রকারেই বন্ধ করে দেওয়া না হয়। শহরের এই স্কুলকে দেখে জেলায় জেলায় স্থাপিত বালিকা বিদ্যালয়গুলো বিশেষ উৎসাহিত হয়। বর্তমান বিদ্যালয়টির নৈতিক প্রভাব অনেক। প্রয়োজনে বেথুন স্কুলের ব্যয় সঙ্কোচন ও উন্নতি সাধন, উভয়ই করা যায়।.

স্বাক্ষর

ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা

নোট পড়লেন মিঃ গ্রে । ভাবলেন, ঈশ্বরচন্দ্রের কাজ সরকারকে এ দেশের প্রকৃত পরিস্থিতির বিচারে মার্গ দর্শন করানো। তা তিনি করেছেন। কিন্তু এই প্রস্তাব সভায় পাশ হয়েছে। সেখানে একজনের বিবেচনায় তা বন্ধ করে দেওয়া সঠিক হবে না। ঈশ্বরচন্দ্রের কাছে সংবাদ গেল। তিনি এই বিষয়ে আর উচ্যবাচ্য করলেন না। চুপ করে রইলেন। যেন এর ভবিতব্য তাঁর জানা।

সরকার থেকে শিক্ষয়ত্রী তৈরির স্কুলের জন্যে টাকা বরাদ হল। ব্যাস। ওই পর্যন্তই সার। পুরোমত্রায় স্কুল গড়া আর হল না। যাকে বলে ন্যরম্যাল স্কুল। বিনা ব্যয়ে টাকা পড়ে রইল। পরে মাত্র হাতে গোণা পাঁচ-ছ জন ছাত্রী নিয়ে স্কুল চালু হল। আর মহিলা পাওয়া যাচ্ছে না।

এভাবে কিছুকাল চলল। নিরুৎসাহের মধ্যে সরকার থেকে আদেশ এলো, এ স্কুল কাজের হচ্ছে না। বন্ধ করে দেওয়া হোক। দেড় বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে গেল। ঈশ্বরচন্দ্র মনে কষ্ট পেলেন। ন্যরম্যাল স্কুল চালু হল না, বা সাময়িক ভাবে চালু হয়ে বন্ধও হয়ে গেল, এ তিনি কামনা করেননি। মিস মেরীর প্রস্তাব উত্তম ছিল। তবে দেশ, সমাজ, বর্তমান সময়ে সমাজে নারীদের অবস্থান, পরিস্থিতি ইত্যাদির বিচারে তা সফল হবার ছিল না, এটা তিনি বুঝেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, সঠিক সময়ে ন্যরম্যাল স্কুল চালু করা। সে সময় এখনও আসেনি। নারীশিক্ষার প্রবাহকে আরও অনেক পথ হাঁটাতে হবে, এটাই সাব্যস্ত করলেন ।

এবার মনকে সংসারের দিকে ফেরালেন। হেমলতার বিয়ে নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছে। উপযুক্ত বয়সে মেয়েকে সুপাত্রস্থ করা পিতার দায়িত্ব। হেমলতা এখন পনেরো পার করে ষোলোর ঘরে পা রেখেছে। মেয়ে পড়াশোনাও করেছে অনেকটা। বিয়ের জন্যে এটাই উপযুক্ত সময়। অথচ তাঁর হাতে এখন অন্য অনেক কাজ। কলিকাতায় আপাতত সেসব স্থগিত রেখেই বীরসিংহে যাওয়া মনস্থ করলেন। বিয়ের কাজ। তাও মেয়ের। দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। কলিকাতায় বসে প্রাথমিক কাজ শুরু করলেন।

(২৩)

ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর গুণমুগ্ধদের কোনও কোনও জনকে নিজের জ্যেষ্ঠ কন্যার বিয়ে দেবার কথাটা জানিয়ে রাখলেন। কারোও নজরে যদি সেরকম সুপাত্র থেকে থাকে। কাজটা তিনি করছেন মায়ের অনুমতি নিয়ে। ভগবতী দেবী ছেলেকে বলেছেন, দেখো বাবা, আমার বড় নাতনীর যেন কোনও উচ্চ বংশের সুপাত্রের সঙ্গে বিবাহ হয়। ঈশ্বরচন্দ্র কথাটা ঘুরিয়ে মায়ের ওপরেই প্রয়োগ করলেন। বললেন, আমি তো দেখছিই মা, তুইও দেখ না। তোর তো এই গ্রামে বেশ পরিচিতি রয়েছে। নজরে রাখ সেরকম পাত্র।

-আহা,আমার আর পরিচিতি কী? পাঁচজনের ঘরে তাদের সুখে দুঃখের সাথ দিতে আমি সেখানে যাই। ঔষধ পথ্য দিয়ে আসি। প্রয়োজনে কিছু চালডাল, সবজী। দু চারটে পয়সা দিয়ে আসি; সে তো তুমি ভালই জানো। তবে তাদের মধ্যে কি আর কেউ হেমলতার জন্যে উপযুক্ত হতে পারে? আমি চাই, হেমলতার পাত্র হবে শহরের ছেলে, বিদ্যান। ভালো চাকরি করে। হেমলতাও তো বিদ্যেশিক্ষে করল…

-ঠিক আছে মা। তোর কথা রেখেই আমি এবার ঘটক ঠিক করছি। ওদের দ্বারাই এই কাজ হয়। ভালো পাত্র খুঁজে এনে দেয়।

কথা সেদিনের মতো এখানেই শেষ হল। ঈশ্বরচন্দ্র ঘটক লাগালেন। চেনা ঘটক। নাম তারাপদ সাঁপুই। লোকটা ইতিপূর্বে ঈশ্বরচন্দ্রের কাছে বার দুয়েক এসেছে। আসলে, এঁরা হচ্ছে, ছুঁচোর ধর্মের। গন্ধ শুঁকেই এসে পড়ে। কন্যা বড় হয়েছে। বিয়ে তো দিতেই হবে। তাই মেয়ের বাপকে  আগে থাকতে ভজিয়ে রাখা। কাজ সুসম্পন্ন হলে, ভালো দাঁও মারা যায় দুপক্ষ থেকেই। এই করেই এঁদের সংসার চলে।

কাজও হল। তারাপদ বগলে ছাতা গুঁজে এক গ্রীষ্মের দুপুরে এসে হাজির। ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর ১২ নং সুকিয়া স্ট্রীটের ভাড়া বাড়ির ঘরে বসে বাংলার ইতিহাসের তর্জমা করছেন ইংরেজ লেখকের লেখা থেকে। তারাদাস অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে প্রথমেই এক গ্লাস জল চাইল ঈশ্বরচন্দ্রের কাছ থেকে। গ্লাসে করে জল দিলেন তিনি। জল পান করে গ্লাস ধুয়ে রেখে সে তার খেরোর খাতা খুলে বসল। পাতা হাঁটকিয়ে পাত্রের নাম ধাম বার করল।

পত্রের নাম গোপালচন্দ্র। পদবী সমাজপতি। পিতা পরলোকগমন করেছেন। মাতা  স্বর্ণময়ী দেবী। এক ভগিনী, নাম ক্ষেত্রমণি । পরিবারের বাস নদীয়া জেলার আইসমালী গ্রাম। পাত্র জেলার সাব-রেজিস্ট্রার।

ঈশ্বরচন্দ্র শুনলেন। বললেন, মুখের কথাগুলি একটা কাগজে লিখে দিয়ে যাও। ব্যাগ হাঁটকে একখণ্ড কাগজ বের করে ঘটক তাতে সবকিছু লিখে দিল। তারপর প্রস্থান করল।

ঈশ্বরচন্দ্র পাত্রের বিশদ বিবরণ সহ মা-বাবাকে পত্র দিলেন। ভগবতী দেবী বিষয়টা দীনময়ীর সঙ্গে আলোচনা করলেন। সকলে একমত, এই পাত্রের সঙ্গেই হেমলতার বিবাহ হবে। ঠাকুরদাস ঈশ্বরচন্দ্রকে চিঠি লিখে অনুমতি দিয়ে দিলেন।

পাত্র দেখা হল। সেখানেই বিয়ের দিনক্ষণ স্থির হল। গ্রীষ্ম পেরিয়ে শ্রাবণ মাসে বিয়ে।

সব রকম আচার বিচার মেনে মহা ধুমধাম করে বিয়ে। ড্রাম, ব্যাগপাইপ  বাজল। আলোকসজ্জায় বাড়ির পথ সাজল। গ্রাম উজাড় করে অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। প্রথম সন্তানের বিয়ে বলে কথা।

দুদিনের উৎসব বাবা, মা, ভাই, বোন, কাকা ঠাকুমা-ঠাকুরদা, সকলকে কাঁদিয়ে হেমলতা স্বামীর ঘরে চলে গেল।

(২৪)

ঈশ্বরচন্দ্র কলিকাতায় ফিরে এসেছেন। এখন তাঁর কাজ, হিন্দু মেট্রোপলিটান ইনিস্টিটিউটকে গড়ে তোলা।

মধ্য কলিকাতায় এই ইশকুল । সেখানে ছাত্রের সংখ্যা সাত’শ। শিক্ষক ষাটজন । তিনতলা বাড়ি জুড়ে ক্লাসঘর। বছর বছর ছেলেরা পাশ করছে। বাইরের কলেজে গিয়ে ভর্তি হচ্ছে।

এই সময়ে একদিন কিছু ছাত্রর সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের আলাপ হচ্ছিল। সদ্য পাশ দিয়েছে তারা । নিজেদের ইশকুল ছেড়ে বাইরে যেতে তাদের মন কাঁদছে। তারা ঈশ্বরচন্দ্রকে জানাল,  যদি এখানেই এফ এ, বি এ পড়ার সুযোগ থাকত? তাহলে বাইরের সংস্কৃত কলেজ, বা প্রেসিডেন্সি কলেজে যেতে হত না। প্রেসিডেন্সিতে ঢুকলে মাসে বারো টাকা মাইনে গুণতে হবে। সংস্কৃত কলেজও কিছু আগের মতো অবৈতনিক নেই। মাইনে সেখানে কম। তবে তা মেট্রোপলিটান থেকে বেশিই।

ঈশ্বরচন্দ্র ছাত্রেদের কথা শুনছেন। প্রাণের থেকে প্রিয় ছাত্ররা তাঁর কাছে কেঁদেকেটে এসব কথা জানাচ্ছে। তাঁর মন ভিজে উঠছে। ভাবছেন, ইন্সিটিটিউট গড়েই কি তাঁর কাজ শেষ? মেট্রোপলিটানকে এত ভালবাসে ছাত্ররা! তারা এখানে থেকেই উচ্চতর শিক্ষা নিতে চায়? তবে কেন না, সেই প্রচেষ্টায় আবার নতুন করে লাগেন? কিছু তাঁকে করতেই হয়। ছেলেদের বিদায় দিলেন। ফিরে এলেন নিজের ঘরে। নিজে হাতে কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে নিলেন। জল খেলেন। চেয়ারে বসলেন। হাতে সেরকম কোনও কাজ নেই। চুপ করে বসে রইলেন। মনে পড়ছে মেট্রোপিলিটান ইন্সটিটিউট নিয়ে পুরনো দিনের কথা। সবটাই যে তাঁর সামনে ঘটেছিল , তা নয়। বহুলাংশেই শোনা। ঘটনা ঘটেছিল নয়-দশ বছর আগে। তখন তিনি পূর্ণ যৌবনে। –

কলিকাতার সিমলার শঙ্কর ঘোষ লেন। বড় রাস্তার থেকে কিছুটা ভিতরে। কলিকাতা ট্রেনিং স্কুল  স্থাপিত হয়েছে। উদ্যোক্তা, ঠাকুরদাস চক্রবর্তী, মাধবচন্দ্র,  পতিতপাবন সেন, গঙ্গাচরণ সেন, যাদবচন্দ্র পালিত এবং বৈষ্ণব আঢ্য। সকলেই  বাবু গোষ্ঠীর লোক। পড়ালেখা করা। অর্থবান। শহরের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তাঁরা নিজের টাকাকড়ি দিয়ে ইশকুল বাড়ির মাসিক ভাড়া মেটান । ছাত্রদের জন্যে বইপত্র কিনে দেন। শিক্ষক, অশিক্ষিক কর্মচারীদের মাস মাইনের জোগান দেন। ইশকুল চলে। ছেলেপুলেদের শিক্ষিত করে তোলবার প্রয়াস। এক কথায় সমাজসেবা। বাণিজ্যিক দিকটা ততটা গুরুত্ব পায় না। কিন্তু নিজের অর্থ লাগিয়ে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু করা এক জিনিষ। আর তা সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করা আর এক কাজ। সে কাজে এঁনারা কেউই বিশেষ অভিজ্ঞ নন।

ইশকুল চালু হয়েছে। দুবছর চলল। তারপরেই নানান অসুবিধে।  ইশকুলের পঠন পাঠন ঠিক হচ্ছে না। ছাত্রদের উন্নতি হচ্ছে না। ইশকুল ছেড়ে ছাত্ররা অন্য ইশকুলে চলে যাচ্ছে। মাস্টারমশাইরা হাত গুটিয়ে বসে তা দেখছেন। মহা সমস্যা। স্থির হল, ইশকুল পরিচালনায় চাই একজন অভিজ্ঞ  ব্যক্তি।  খোঁজাখুঁজি শুরু হল।

মিটিং বসল। স্থান, ইশকুলের ঘর। ইশকুল ছুটির পর। গুরুতর বিষয়ে মিটিং। ম্যানেজিং কমিটির পাঁচ সদস্যই উপস্থিত। আলোচনায় এ নাম, সে নাম উঠে আসছে। কেউই সেসবে রাজী হচ্ছেন না। হঠাৎ বাবু গঙ্গারাম বলে উঠলেন, আচ্ছা, যদি বিদ্যাসাগর মশাইকে ধরা যায়?

সংশয়ের মধ্যে অন্যজনের কথা।-ওনার মতো ব্যক্তি এতে রাজী হবেন কি?

-প্রস্তাবটা দিয়েই দেখা যাক না? উনি নিজেও তো লেখাপড়া ভালোবাসেন।

বললেন, পতিতপবন। মাধবচন্দ্র বললেন, এমন আহ্বানে উনি পিছপা হবেন না, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস? সরস্বতীর বরপুত্র তিনি। তাঁর মাধ্যম দিয়ে দেবী সরস্বতী বাংলার ঘরে ঘরে ছেলেমেয়েদের মাঝে বিদ্যার আলো ছড়াচ্ছেন।

-হ্যাঁ। হ্যাঁ। তা বটে।

সমস্বরে বলে উঠলেন সকলে। প্রস্তাব পাশ হোলো। মাঝ থেকে শুধু ঠাকুরদাস প্রশ্ন তুললেন, ওনাকে কি পরিচালন কমিটিতে রাখা হবে, নাকি, অন্য পদ দিয়ে বহালি হবেন?

-আরে রাম রাম। ওনার মতো মানুষকে কি কাজে বহালি করবার ক্ষমতা আমাদের আছে; না উনি তাতে এখানে আসবেন? কেন, পরিচালন কমিটিতে রাখতে আপত্তি কোথায়, ঠাকুরদাস?

-আপত্তির কথা আমি বলছি না। পরিচালন কমিটির সকলে তাতে রাজি তো?

-আমরা রাজি।

আবার সমস্বরে কথা। পরে বাবু বৈষ্ণব আঢ্য যোগ করলেন, আমরা সকলে মিলে একদিন ওনার কাছে গিয়ে প্রস্তাব রাখব।… দেরী করা নয়। আগামী বৃহস্পতিবারেই চলুন।

তাই হল। পাঁচজন মিলে এসেছেন। বাদ ঠাকুরদাস চক্রবর্তী। নিজস্ব কিছু কাজ দেখিয়ে অনুপস্থিত রইলেন তিনি।

এরপরের ঘটনা তো তাঁর সামনেই ঘটেছে। মনে পড়ছে,  তিনি কাজ করছিলেন নিজস্ব ডিপজিটারিতে বসে। এতজন আগন্তুককে দেখে একটু অবাক হলেন। কিছুজনের মুখ চেনেন। সবার নয়। বসবার আহ্বান জানালেন। তিনজন বসলেন। দুজন দাঁড়িয়ে রইলেন। ছোট জায়গা। বেশি চেয়ার রাখবার স্থান সঙ্কুলান হয়নি। তিনি সামান্য অপ্রস্তুত হলেও আগন্তুকরা মানিয়ে নিলেন। কথা শুরু হল। একসময় আসল কথায় এলেন তাঁরা। কথাটা বললেন গঙ্গাচরণ সেন। তিনি শুনলেন। প্রশ্ন রাখলেন, এখন কি ইশকুল তাহলে চলছে না?

-চলছে। তবে এভাবে বেশিদিন চালানো যাবে না, বিদ্যাসাগর মশাই। পতিতপাবন বাবুর কথা।

-ইশকুল পরিচালনায় আমার দায়িত্ব কতটুকু? তাঁর প্রশ্ন।

-আপনি পরিচালন কমিটিতে থেকে এই বিষয়ে সুপরামর্শ দেবেন।

-পরামর্শ কার্যকর করা হবে তো? সে দায়িত্ব কিন্তু পুরো পরিচালন কমিটিকেই নিতে হবে। রাজি?

সোজাসাপ্টা কথা তাঁর। জানেন, একের বোঝা অনেকে বইতে গেলে, বোঝা হাল্কা হয় বটে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মতের অমিল ঘটে। তাতেই বোঝা আরও ভারি হয়ে ওঠে। হাল্কা হওয়া তো দূরের কথা।

-সে তো ঠিক। সে তো ঠিক…

কথা চলল। একসময় আলোচনা শেষ হল। তিনি রাজি হলেন। পরিচালন কমিটিতে যোগ দিলেন। সঙ্গে আনলেন বাবু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর অতি বিশ্বস্ত সুহৃদ। নিজের ঝুলিতে তখন সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ সামলানোর প্রাঞ্জল অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। পরিচালন কমিটিতে এসে অচিরেই ইশকুলের উন্নতিসাধনে ব্রতী হলেন । এবং তা সম্পূর্ণ করে উন্নতিও সাধন করলেন।

কিন্তু, তা হলে কী হবে? অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট, আপ্ত বাক্যকে প্রমাণিত করে কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ বেধে গেল। ঘটনা সামান্যই-কোন এক অনুপযুক্ত শিক্ষকের পদচ্যুতি। তাই নিয়ে গণ্ডগোল। গণ্ডগোল বাধালেন, ঠাকুরদাস চক্রবর্তী। তিনি উপস্থিত সদস্যদের সামনে প্রশ্ন রেখছেন, একেবারে পদচ্যুতি? কেন গড়েপিটে নেওয়া যায় না কি?

ঈশ্বরচন্দ্র জবাব দিলেন, মহাশয়, শিক্ষক গড়াপেটার জায়গা ছাত্রদের ইশকুল নয় । উনি তো ওনার কাজের অযোগ্য ব্যক্তি।

-আজ একজন শিক্ষক। আগামীকাল অন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধেও ছাত্ররা অভিযোগ আনতে পারে। তখন কি করবেন, বিদ্যাসাগর মশাই?

-ছাত্রদের অভিযোগকে মান্যতা দিতেই হবে। ইশকুল তো তাদের জন্যেই। তাছাড়া, আমি বিশ্বাস রাখি, শিক্ষকের পড়ানোয় ছাত্ররা যদি উপকৃত না হয়, তবে তাদের অধিকার রয়েছে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর।

-এটা বোধ হয় একটু বেশিই স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে ছাত্রদের। ঠাকুরদাস বললেন। তাঁকে সমর্থন জানালেন আঢ্য মশাই।

এক কথা দু কথায় মতবিরোধ বাড়তেই থাকল। তা শেষ হল, ইশকুলকে দু টুকরোয় ভাগাভাগি করে নিয়ে। এমন প্রস্তাবে বিশিষ্ট জনদের প্রাণ একবারের জন্যেও কাঁদল না।

ঈশ্বরচন্দ্র বুঝে নিলেন, বাঙালির চরিত্রে একসাথে চলবার খামতির দিকটা। এ তো তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়? সবই স্বার্থের খেল। নিঃস্বার্থতার অভাব। এঁরা নিজেদের কিছু ক্ষতি স্বীকার করে সাধারণের হিতসাধন করতে শেখেননি। এদেশে দশজনে মিলে কাজ করবার সময় এখনও আসেনি।

তবে নিজে তিনি অন্য ধাতুতে গড়া। তা না হলে, পকেটের অর্থ দিয়ে দিকে দিকে ইশকুল গড়তেন? শুধু কি, ইশকুল গড়েই তাঁর কাজ শেষ হয়েছে? তিনি তো সেসব ইশকুলের মাসিক ব্যয়ভারও বহন করছেন। শিক্ষায় ব্যবসায়ী দিক  চিন্তাই করতে পারেন না। তাই ওধরণের মানুষের সঙ্গে কাজ করা তাঁর দ্বারা সম্ভব নয় জেনে, পরিচালন কমিটি থেকে অবসর নিয়ে  নিলেন। তাতে ইশকুল বন্ধ হল না ঠিকই, তবে দিন দিন কলিকাতা ট্রেনিং ইশকুল শীর্ণকায়া হয়ে পড়তে শুরু করল।

সুষ্ঠ পরিচালনার অভাবে ঘটে চলেছে ছাত্রাভাব এবং অর্থাভাব। দুই-ই ইশকুলকে পঞ্চত্ব প্রাপ্তির দিকে যখন নিয়ে যাচ্ছে, তখনই আবার তাঁর ডাক পড়ল।  প্রচার হল, যাঁর নাসে নাসে বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের অণু পরমাণু দৌড়ে বেড়াচ্ছে, তার পক্ষে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা কি সম্ভব?

পরিচালন সভায় তাঁর  পুনরনিয়োগ ঈশ্বরচন্দ্র উপেক্ষা করলেন না। তবে যা করলেন, তা হচ্ছে, নিজের নিয়ম কানুনের প্রবর্তন- পরিচালন সভায় পুরনো সদস্যদের মধ্যে  কেউ আর  মতামত দেবার যোগ্য থাকবে না। বড় কঠিন নিয়ম!

তিনি এও জানিয়ে দিলেন, একনায়কতন্ত্রে কায়েম করায় তিনি বিশ্বাসী নন। পরিচালন সভা পুনর্গঠিত হবে। চারজন সদস্য। রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ, রাজা রমানাথ ঠাকুর, বাবু হীরালাল শীল আর বাবু রামগোপাল ঘোষ।    সভার সম্পাদকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। কুশলী ব্যবস্থা। এসবই নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর সমাজে পরিচিতির ফল। দীর্ঘ নিয়মাবলী তৈরী হল। তরতর করে ইশকুল চলতে থাকল। উন্নতির শিখরে পৌছিয়ে গেল কলিকাতা ট্রেনিং স্কুল…

ভাবনার মাঝে বর্তমান সময়ে ঢুকে পড়লেন ঈশ্বরচন্দ্র।

দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যেমন সাংসারিক দায়দায়িত্ব বাড়ছিল, তেমন শরীরেও ভাঙন বাসা বেঁধেছে। বিশেষ করে উত্তরপাড়ায় ঘটা দুর্ঘটনার কারণে। ইদানিং খাওয়াদাওয়ায় অনেক পরিবর্তন এসেছে।  ভাত আর মাছের ঝোল। তাও প্রায় সিদ্ধ। তেল বিহীন। রাতে সামান্য সাবুর রুটি, কোনও দিন বা তাও নয়। জল মুড়ি; আর না হলে উপোষ। আসলে যকৃতের অসুখ তাঁকে কাহিল করে রাখে। বত্রিশ টাকা ভিজিটের ডাক্তার, মহেন্দ্রলাল সরকার তো জানিয়েই দিয়েছিলেন, দুর্ঘটনায় তাঁর যকৃত এখন উল্টো হয়ে অবস্থান করছে। ফলে প্রায়শই পেটের গোলমাল হয়। খাওয়ায় ধরাকাট। ডাক্তার তো শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে যকৃতকে পুণস্থাপন করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তিনি তাতে রাজী হননি।

 

এতসব ঝক্কি ঝামেলা স্বত্বেও তিনি এখন ফের ঝাঁপিয়েছেন  ইশকুলকে কলেজে পরিবর্তনের জন্যে। কলিকাতা ট্রেনিং ইশকুলকে নাম বদল করে এফ এ ও বি এ পড়াবার উপযুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আবেদন করলেন।

পরিচালন সভায় প্রস্তাব রাখলেন, ইশকুলের নতুন নাম রাখা হোক, হিন্দু মেট্রোপোলিটান ইন্সটিটিউট। প্রস্তাব গৃহীত হল। উন্নত পরিবর্তন।

প্রশ্ন উঠল, কলেজের পরিবর্তন তো হবে, তবে ব্যয় তো  আগের থেকে বেশিই হবে। তার আর্থিক দায় কারা নেবে?

ব্যয়ভার ভাগ করে নিতে রাজি করালেন, রাজা প্রতাপ সিংহ রায়, হরচন্দ্র ঘোষ বাহাদুরকে। তবে বেশিটাই রাখলেন নিজের ভাগে। স্থির হল, পাঁচ বছর পর্যন্ত এই ব্যয় তাঁরাই বহন করবেন।

মুচলেকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আবেদন পাঠান হল। আবেদনে স্বাক্ষর করলেন, সেনেটের সদস্য হিসেবে রাজা রমানাথ ঠাকুর এবং বাবু রামগোপাল ঘোষ।

অথচ এতকিছুর পরেও এক উটকো ঝামেলায় সবকিছু কেঁচিয়া যাবার অবস্থা দাঁড়াল।

এতদিন ইশকুল চলছিল এক ভাড়া বাড়িতে। মাসিক ভাড়া পঞ্চাশ টাকা। বাড়ির মালিক শ্রীযুক্ত খেলাৎ ঘোষ । ইশকুল বাড়ছে দেখে তিনিও ভাড়া বাড়িয়ে দিলেন। পঞ্চাশের জায়গায় মাসিক এক’শ টাকা।

ঈশ্বরচন্দ্র তা মানতে রাজী হলেন না। নানান আলোচনাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে, খেলাৎ মশাই কোর্টে কেস ঠুকে দিলেন, বাড়ি ছাড়া করানোর জন্যে ।

বিপদ বুঝে অন্যান্য সদস্যরা ইশকুলের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে সরে দাঁড়ালেন । এখন সব ভার এসে পড়ল তাঁর ওপর।

ঈশ্বর ভগবানে আস্থা তাঁর কম। তবু ঐশ্বরিক শক্তিতে তিনি বলীয়ান। সেই জোড়ে সব দায় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন।  মেট্রোপোলিটান ইন্সটিটিউটের পুরনো আস্তানা ছেড়ে দিলেন।  ইশকুল তুলে আনলেন, নতুন জায়গায়। সুকিয়া স্ট্রীটে। এক খালি বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে নতুন করে মেট্রোপলিটান ইন্সটিটিউট বসালেন। ইশকুল চলতে থাকল।

ইতিমধ্যে ঈশ্বরচন্দ্রের প্রথম কন্যা , হেমলতা তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছে। বিয়ের তিন বছরের মাথায়। ছেলে হয়েছে। নাম দিয়েছে সুরেশ। ঈশ্বরচন্দ্রেরই দেওয়া নাম।

নাতি বীরসিংহে এলেই ঈশ্বরচন্দ্রের মন বাড়ির দিকে টানতে থাকে। কখন সেখানে যাবেন, কতক্ষণে নাতিকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করবেন।  আসলের চেয়ে সুদ বেশি মিষ্টি- চিরন্তন বিষয়। যতই কিনা তিনি বইলেখা, ইশকুল বানানো,  ইনিস্টিটিউট গড়ুন, তাঁর অন্তর যে স্নেহছায়াময়, মমতার অতলে ডুবে থাকে, তা তিনি এখন নাতির সান্নিদ্ধে আসলে ভালই বুঝতে পারেন।

চলবে…

শেয়ার করতে:

You cannot copy content of this page